হাসানুজ্জামান রাজীব \ ১৮৬০ সালে যাত্রা শুরু। সময়ের বহু ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও ইতিহাস আর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে কুষ্টিয়ার উজানগ্রাম হাট। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহা সামনে রেখে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে প্রায় ১৬৬ বছরের এই ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট। সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খামারিরা তাদের লালন-পালন করা গরু ও ছাগল নিয়ে হাজির হচ্ছেন হাটে। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তজুড়ে শুধু পশু আর মানুষের কোলাহল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের গরু দিয়ে পুরো হাট এখন উৎসবমুখর। কেউ পরিবারের জন্য পছন্দের কোরবানির গরু খুঁজছেন, আবার কেউ দরদাম মিলিয়ে শেষ মুহুর্তের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিক্রেতারাও ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতাদের সঙ্গে দামের আলোচনা নিয়ে। খাদ্য ও লালন-পালনের খরচ আগের চেয়ে বেড়ে গেলেও ভালো দামের আশায় খামারিরা তাদের সেরা পশুগুলো নিয়ে এসেছেন এই ঐতিহ্যবাহী হাটে। হাটে আসা বিক্রেতা আব্দুল বলেন-“অনেক কষ্ট করে গরু পালন করেছি। খাবারের দাম বেশি ছিল, তারপরও আশা করছি ভালো দাম পাব।”“উজানগ্রাম হাটে ভালো ক্রেতা আসে। তাই প্রতি বছর এখানেই গরু নিয়ে আসি।” দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটের ভিড়ও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ গরুর গঠন দেখছেন, কেউ দাঁত মিলিয়ে বয়স যাচাই করছেন, আবার কেউ ওজন বুঝে হিসাব কষছেন কোরবানির প্রস্তুতির।
ক্রেতা আব্দুল মমিন বলেন-“অনেক গরু দেখছি। দেশি গরুর সংখ্যা বেশি, দামও মোটামুটি সহনীয়। আশা করছি ভালো একটা গরু নিতে পারবো।” হাটের ইজারাদাররা বলছেন, পুরো বেচাকেনা নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। নিরাপত্তাকর্মী, পর্যাপ্ত আলো এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে দিকেও রাখা হচ্ছে কড়া নজর। ইজারাদার মোজাম্মেল হক বলেন-“খামারি ও ক্রেতাদের সুবিধার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমরা চাই সুন্দর পরিবেশে সবাই নিরাপদে কেনাবেচা করতে পারুক।” প্রান্তিক খামারিদের জন্য রাখা হয়েছে হাসিলে বিশেষ ছাড়। এছাড়া ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে পশুর ওজন মাপার সুযোগ থাকায় ক্রেতারাও পাচ্ছেন স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা। এতে করে দামের বিষয়ে বাড়ছে আস্থা। দেশি উন্নত জাতের গরুর আধিক্য, খামারিদের প্রাণচাঞ্চল্য আর ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে উজানগ্রাম হাট। শত বছরের এই ঐতিহ্য যেন শুধু পশু কেনাবেচার স্থান নয়, বরং কুষ্টিয়ার মানুষের আবেগ, স্মৃতি আর সংস্কৃতির এক জীবন্ত অংশ। ঐতিহ্য আর উৎসবের মেলবন্ধনে আবারও প্রমাণ মিলছে—উজানগ্রাম হাট শুধু একটি হাট নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক ইতিহাস।
