কুমারখালী প্রতিনিধি \ পরিবারের সুখের জন্য কয়েকটি এনজিও এবং ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণ নিয়ে প্রবাসে গেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যুবক শাহেদ ইসলাম জাহিদ (৩৫)। কিন্তু দালালের খপ্পরে প্রবাসে গিয়ে প্রায় ছয় মাসেও চুক্তি অনুযায়ী কাজ পাননি তিনি। সেজন্য বাড়িতে চাহিদামতো টাকাও পাঠাতে পারছেন না। ফলে দুই মাসের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। আর সেই কিস্তির চাপ সইতে না পেরে আবেগঘন চিরকুট লিখে গলায় ফাঁস নিয়ে তাঁর স্ত্রী জুলিয়া খাতুন (২৭) আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ স্বজনদের। সোমবার (৮ জুন) সকাল ১১টার দিকে কুমারখালী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউতলা এলাকায় অবস্থিত নিজঘর থেকে জুলিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহিদুল- জুলিয়া দম্পতির তানহা (৭) নামের এক কন্যা সন্তান রয়েছে। গৃহবধূ জুলিয়ার চিরকুটটি আন্দোলনের বাজার পত্রিকার হাতে এসেছে। তাতে লেখা রয়েছে, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমাকে আপনারা সবাই মাফ করে দিবেন। মা তুমি আমাকে মাফ করে দিও। আমি তোমার ভাল মেয়ে হতে পারিনি। তানহাকে তুমি দেখে রেখ।’ চিরকুটে আরও লেখা আছে, ‘আর আমার শেষ ইচ্ছে হল আমাকে যেন কোনো পুরুষ না দেখে, সেইটা তোমরা দেখও। আর আমার লাশটাকে তোমরা কাটাছেড়া কইরো না। এটাই আমার শেষ ইচ্ছে। তোমরা পুলিশের কাছেও যেওনা কেউ। ও মা, তুমি ঠিকই বলেছিলে। আল্লাহর কাছে সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায়না। আমাকে মাফ করে দিও।’ পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ১০ বছর আগে পারিবারিকভাবে কুমারখালী পৌরসভার ঝাউতলা এলাকার মৃত জহিরুল ইসলামের মেয়ে জুলিয়ার সঙ্গে একই এলাকার ইদ্রিস আলীর ছেলে জাহিদের বিয়ে হয়। তাঁদের কোলজুড়ে তানহা নামের ৭ বছর বয়সি এক কন্যা সন্তান আছে। প্রায় ৬ মাস আগে এনজিও ও ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কাতারে গেছেন জাহিদ। কিন্তু সেখানে চুক্তি অনুযায়ী তিনি কাজ পাননি। ফলে চাহিদা অনুয়ায়ী সময়মতো বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেন না তিনি। তাঁর শ্বাশুড়ি, বাবা ও স্বজনরা মিলে কিস্তির টাকা কমবেশি করে পরিশোধ করেছেন। তবুও দুই মাসের কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে গেছে। সোমবার সকালে একটি এনজিওতে কিস্তি বাবদ দুই হাজার টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু সকাল ৭টার দিকে নিজঘরের আড়াঁর সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলতে দেখেন তাঁর মেয়ে তানহা। এরপর স্বজনরা জানালা ভেঙে তাকে নিচে নামিয়ে পানি ঢেলে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রবাসী জাহিদের বাড়িতে উৎসুক জনতা ভিড় করেছেন। কাজ করছে পুলিশ। আহাজারি করছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। স্মার্টফোনের ভিডিও কলের মাধ্যমে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন জাহিদ। এ সময় জাহিদকে কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘আমার স্ত্রী ভালো মানুষ। আমাদের খুব সুখের সংসার ছিল। কোনো ঝৈ ঝামেলা ছিলোনা। আমার কোনো অভিযোগ নেই। একটায় অনুরোধ আপনারা পোষ্ট মর্টেম করবেন না।’ নিহত জুলিয়ার চাচা রজব আলীর ভাষ্য, সংসারে কোনো অভাব ছিলোনা। তবে জামাই অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছেন। কিন্তু কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী কাজ দেয়নি। ঠিকঠাকও বেতনও দেয়না। দুইমাস ধরে কিস্তির টাকাও দিতে পারছেনা। হয়তো কিস্তির চাপ সইতে না পেরে চিঠি লিখে আত্মহত্যা করেছে জুলিয়া। জুলিয়ার শ্বশুর ইদ্রিস আলী কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সংসারে কোনো ঝামেলা নেই। কারো সাথে ঝগড়াও নেই। মেয়েটা সবসময় পর্দায় থাকে। তবে একটায় সমস্যা মেলা টাকা কিস্তির লোন আছে। এই টাকা আস্তে আস্তে দিচ্ছে। কিন্তু এই মাসে টাকা পাঠাতে পারি নাই। আজ (সোমবার) দুই হাজার টাকার কিস্তি ছিল। এই টেনশনেই কি কিছু একটা করল? তা বুঝতে পারি নাই। তাঁর ভাষ্য, বিদেশ যাওয়ার জন্য বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যাংকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণ আছে। আজকে আশা সমিতির ৬০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল। তার আগেই এ ঘটনা ঘটে গেছে। চিরকুটের কথা নিশ্চিত করে কুমারখালী থানার পরিদর্শক ( তদন্ত) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে জুলিয়া গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কারো কোনো অভিযোগ না থাকায় সুরতহাল শেষে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
