ঢাকা অফিস \ দীর্ঘ দেড় দশকের ‘শহরকেন্দ্রিক’ ও ‘বিদেশি ঋণনির্ভর’ মেগা প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন মডেল থেকে বেরিয়ে এসে এবার দেশের প্রাণভোমরা—‘গ্রামের’ দিকে নজর দিয়েছে সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক দর্শনের আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যেও সেই ‘জনমুখী সমৃদ্ধি’ ও ‘গ্রামীণ অর্থনীতি’ চাঙ্গা করার সুস্পষ্ট রূপরেখা ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির প্রাণ কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় গ্রামে, খেত-খামারে, খাল-বিলে। শহরের উঁচু অট্টালিকা কিংবা চকচকে উন্নয়ন সূচকের পেছনে যে শক্ত ভিত দাঁড়িয়ে আছে, তা মূলত গ্রামীণ অর্থনীতি। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যার লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের মূল হাতিয়ার হিসেবে বাজেটে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, সেচ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই নতুন অর্থনৈতিক দর্শন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপি সবসময় স্বনির্ভর দেশ গড়ায় বিশ্বাসী। তাই পরনির্ভরশীল না হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে সরকার গঠনের শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তৃণমূলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই তার প্রধান লক্ষ্য।’ গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সরকার পহেলা বৈশাখে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করেছে। টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক মাটিতে উদ্বোধন হওয়া এই কার্ড দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে এই কার্ড দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এজন্য বাজেটে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কার্ডধারী কৃষকরা ১০ ধরনের সরাসরি সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারি ভর্তুকি ও নগদ প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ-কীটনাশক, সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, ‘শস্য ও কৃষি বীমা’, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে পণ্য বিক্রির সুযোগ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সহায়তা, উন্নত চাষাবাদের প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও রোগবালাই পূর্বাভাস এবং ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কৃষকদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে, যার জন্য বাজেটে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবন চলে। জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ হলেও শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈষম্য দূর করতে হলে কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে না দেখে একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত করতে হবে। এই লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও ক্ষুদ্র শিল্পকে (এসএমই) শক্তিশালী করার ওপর বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শহরমুখী বড় কর্পোরেট ঋণের বদলে এবার সরকার তৃণমূলের ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ প্রবাহ সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক খাতের ঋণ প্রবাহ সহজীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতের জন্যই ৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) বিকাশে সরকারের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশজুড়ে খাল খননের নতুন উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত কৃষি অর্থনীতির পুনর্জাগরণের একটি বড় প্রচেষ্টা। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোদাল হাতে নেমেছিলেন খাল খনন কর্মসূচিতে। সেই সময় প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খননের ফলে দেশে ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটেছিল। সেই ঐতিহ্যের পথ ধরে ২০২৬ সালে নতুন সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই দিনাজপুরের কাহারোলে তারেক রহমান দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’-এর উদ্বোধন করবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ যোগাযোগ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে আগামী অর্থবছরে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি সবসময় একটি ‘রিস্টোরেশন’ বা পুনর্গঠনের দল হিসেবে পরিচিত। শহীদ জিয়াউর রহমান যেমন বহুদলীয় গণতন্ত্র ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির ভিত গড়েছিলেন, ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নারী শিক্ষায় অগ্রগতি এনেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিচ্ছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতি বছর ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইটি খাতকে রপ্তানির দ্বিতীয় প্রধান খাত হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মাঝে নতুন বাজেট ও অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। দিনাজপুরের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘অনেক পরিকল্পনা আসে, আবার থেমেও যায়। এবার যদি সত্যি কাজ হয়, তাহলে আমাদের জীবন বদলাবে।’ তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা টুটুল রহমান বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু সুযোগ কম। সরকার যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করে, তাহলে আমরা অনেক কিছু করতে পারবো।’ শহরের মেগা প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও টেকসই উন্নয়ন শুরু হয় মূলত মাটির কাছ থেকে। সেই মাটির মানুষ—কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তবেই শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।
