কুমারখালী প্রতিনিধি \ ইসাক মিয়ার বয়স সত্তর ছুঁই ছুঁই। সাত ভাই- বোনের মধ্যে সবার ছোট। বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আশির দশকে তিনি দুই বিঘা মাঠান জমি ( কৃষি) ও ৪০ শতাংশ বসতভিটা মাত্র ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে গিয়েছিলেন সিলেটে। তবে সেখানে এক দালালের খপ্পরে পড়ে তাঁর আর বিদেশ যাওয়া হয়নি। সহায় সম্বল হারিয়ে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গে ইসাকের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এরপর থেকে পথে ঘাটে বাজারে স্টেশনে কেটে গেছে জীবন ও যৌবনের প্রায় ৪৫ বছর। দালালের খপ্পরে হারিয়েছেন পরিবার, অর্থ আর স্বাভাবিক জীবন। বর্তমানে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন এক অচল মানুষ। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে আশার আলো এই যে, প্রায় ৪৫ বছর পরে স্বজনদের কাছে ফিরছেন ইসাক মিয়া। স্যোসাল মিডিয়ার কল্যাণে সন্ধান পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে ছুটে আসেন তাঁর স্বজনরা। দুপুরে স্বজনদের কাছে তাকে হস্তান্তর করেন উপজেলা প্রশাসন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার, থানার পরিদর্শক ( তদন্ত) আমিরুল ইসলাম, ইসাকের ভাগ্নে বাচ্চু মিয়া ( ৬০) ও হাজী মো. সাজাহান মিয়া (৬৫), ভাতিজা তাহের মিয়া (৩৫), কুমারখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি কে এম শাহিন, যুগান্তর ও মাইটিভির কুমারখালী প্রতিনিধি লিপু খন্দকার, কালবেলা ও চ্যানেল এসের কুমারখালী প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন প্রমূখ। ইসাক মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের মৃত সাদু মিয়ার ছোট ছেলে। তিনি আশির দশকে বিদেশ যাওয়ার জন্য জমিজায়গা বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে যাননি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেফিরে জীবনের প্রায় ৪৫ বছর কাটিয়ে রোগে শোকে কাতর হয়ে তিনি সম্প্রতি কুমারখালী স্টেশনে অবস্থান করছিলেন। স্থানীয়রা টের পেয়ে তাকে চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। এরপর তাকে নিয়ে একটি গণমাধ্যমের ফেসবুকে একটা ভিডিও কনটেন্ট প্রকাশ হলে স্বজনরা তাঁর সন্ধান পান এবং কুমারখালীতে ছুটে আসেন। এতথ্য জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন, স্বজন ও স্থানীয়রা। দুপুরে কুমারখালী স্টেশনের বিশ্রামাগারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অযত্ন আর বয়সের নুইয়ে পড়ছেন বৃদ্ধ ইসাক। অসুস্থ শরীর নিয়ে কখনও বসছেন চেয়ারে, কখনও বা মেঝেতে শুয়ে পড়ছেন। তাকে ঘিরে স্বজন ও স্থানীয়রা আবেগ আপ্লুত। কেউ কেউ আবার মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন সেসব দৃশ্য। এ সময় ইসাকের ভাগ্নে বাচ্চু মিয়া জানান, তাঁর মায়েরা সাত ভাইবোন। তাঁরা হলেন – কালা মিয়া, ধলা মিয়া, ইসাক মিয়া, জজ বানু, কালেস্টার বানু, বালেস্টার বানু ও মালেস্টার বানু। তাঁর মায়ের নাম মালেস্টার বানু। তাঁর ছোট মামা ইসাক মিয়ার লন্ডনে যাওয়ার স্বপ্ন ছিলো। সেজন্য সাত ভাইবোন মিলে প্রায় ৪৫ বছর আগে দুই বিঘা মাঠান জমি ও ৪০ শতাংশ জমিসহ বসতভিটা ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিল। সেই টাকা নিয়ে মামা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, ইসাক মিয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো ভাইবোন বেঁচে নাই। এতো বছর পরে তাকে পেয়ে আবেগ আপ্লুত সকলেই। আরেক ভাগ্নে সাজাহান মিয়া বলেন, সপ্তাহখানেক আগে অনলাইনে এক ভিডিওতে দেখা যায় মামা কুমারখালী স্টেশনে। তিনি ( ইসাক) গ্রামের নাম ও নানা – মামাদের নাম বলছেন। পরে স্থানীয় সাংবাদিক মনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আজ মামাকে নিতে এসেছন। তাঁর বাড়িতে কেউ নেই। আমরাই তাকে চিকিৎসা করাবো। যতদিন বাঁচে আদর যত্ন করব। মামাকে পেয়ে সবাই মহা খুশি।
ভাতিজা তাহের মিয়া জানান, ফেসবুকে একটি পত্রিকার ভিডিও দেখে হারানো চাচাকে খুঁজে পেয়েছি। বাবার মুখে চাচার অনেক গল্প শুনতাম। এতোদিন পরে চাচাকে ফিরে পাবো তা কল্পনাও করিনি। বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতো। তাঁর ভাষ্য, মিডিয়া আর ফেসবুকের কল্যাণে চাচাকে ফিরে পাওয়া গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ২৬ দিন আগে স্টেশের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়েছিল ইসাক। প্রথমে সবাই ভেবেছিল মৃত। পরে উদ্ধার করে চিকিৎসা প্রদান ও খাবার দেওয়ার পর অল্প অল্প করে কথা বলা শুরু করেন। এরপর তাকে নিয়ে খবর প্রকাশ হলে তাঁর ভাগ্নে ও ভাতিজা আজ নিতে এসেছে। স্বজনদের কাছে ইসাক ফিরিয়ে দিতে পেরে খুশি সকলেই। বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না ইসাক মিয়া। তবে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার লাইগা জাগাজমি সব সম্পত্তি বেইচা দিয়া সিলেট গিছলাম। দালালে টেহা মাইরা দিছে। পাগলের মতো পথেপথে ঘুরছি। আজ ভাগ্নে নিতে আইছে। বাড়ি যামু। ভাল লাগছে।’ সাংবাদিক মনোয়ার হোসেন বলেন, দালালের খপ্পরে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গে ইসাক হারিয়েছেন অর্থ, পরিবার, এমনকি মানসিক ভারসাম্যও। তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর স্বজনরা নিতে এসেছে। আজ গণমাধ্যমের জয় হয়েছে। ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, প্রায় ৪৫ বছর পথেপথে বেড়ানোর পর গণমাধ্যমের কল্যাণে ইসাক মিয়া বাড়ি ফিরতেছে। যাচাই – বাছাইয়ের পর তাকে তাঁর দুই ভাগ্নেসহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত আনন্দের। সমাজ ও দেশের কল্যাণে সংবাদকর্মীদের বেশি বেশি কাজ করার আহবান জানান তিনি।
