ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন জরুরি

ফিচার:

বিগত দেড় দশকের অর্থনৈতিক পথপরিক্রমার দিকে তাকালে আজ একটি রূঢ় সত্য প্রকট হয়ে ধরা দেয়-উন্নয়নের চাকচিক্য আর মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশ এক ভয়াবহ ঋণের জালে বন্দি হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালে যে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬৯ ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫৭ ডলারে। পরিসংখ্যানের এই উলম্ফন কেবল খাতা-কলমের হিসাব নয়; এটি মূলত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে নেওয়া ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণের সিংহভাগই এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে এক দুঃসহ বোঝা হয়ে চেপে বসেছে। এই ঋণের সংকটে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এর কাঠামোগত দুর্বলতা। উন্নয়নের নামে নেওয়া ঋণের একটি বিশাল অংশ ব্যয় করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রানির্ভর প্রকল্পে, যা কোনোভাবেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম নয়। ফলে ঋণের কিস্তি যখন ডলারে পরিশোধ করতে হচ্ছে, তখন টান পড়ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। যে ঋণের সুফল পাওয়ার কথা ছিল জনগণের, আজ সেই ঋণের সুদ বা সার্ভিস চার্জ মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে স্থানীয় উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণের টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করা হচ্ছে, অথচ প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। এমনকি বেসরকারি খাতের ঋণের গ্যারান্টি রাষ্ট্রকে দিতে হওয়ায় অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশত্যাগ করলেও সেই দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরেই এসে পড়ছে। স্বভাবতই ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রথমত, উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে, যাতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো বা শর্ত কিছুটা শিথিল করা যায়। দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভর বিলাসী ব্যয় কমিয়ে এবং অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্পের মোহ ত্যাগ করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিটি ডলার সাশ্রয় করতে হবে। তৃতীয়ত, পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং ভবিষ্যতে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম এমন প্রকল্পেই ঋণ নেওয়ার কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, প্রতিটি ঋণের হিসাব ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নের আড়ালে জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপানোর এ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না।