ঢাকা অফিস:
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচারের দাবিতে রাজধানীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী বলে দাবি করা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিও জানানো হয়। গতকাল শুক্রবার (১৫ মে) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনের শিরোনাম ছিল ‘প্রতিরোধযোগ্য হাম রোগে নিষ্পাপ সম্ভাবনাময় শিশু হত্যার জন্য দায়ী ইউনূস-নূরজাহান গংদের বিচার ও মৃত শিশুদের ক্ষতিপূরণের দাবি’। মানববন্ধনে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ সময় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মৃত শিশুদের প্রতিকৃতি (মোটিফ) প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানানো হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশে টিকার সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকারি হিসাবে ৫ শতাধিক শিশু মারা গেছে বলে দাবি করেন তারা। বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়। তারা বলেন, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং পরিকল্পিত মানবিক বিপর্যয়। এ ঘটনায় দায়ীদের বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে টিকা সংকটে মৃত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ক্রিয়েটিভ রাইটার্সের মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালির সঞ্চালনায় মানববন্ধনের মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র পরিচালক, কলাম লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট এস এম কামরুজ্জামান সাগর। মানববন্ধনে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সাকিল আহমদ (অরণ্য) বলেন, “সরকারি গাফিলতির কারণে অকালে চলে গেছে শত শত শিশু। গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান আমাদের ব্যথিত করেছে। আজ আমরা শুধু শোক প্রকাশ করতে আসিনি, বিচার দাবি করতেও এসেছি। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যকর টিকা ব্যবস্থা বাতিল করে ভ্যাকসিন ক্রয়নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়। এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে তথাকথিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ করেছে। এ চুক্তির ফলে দেশীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অ্যাডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তী বলেন, আমি চাই ইউনূস, নূরজাহান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হোক। তারা যেন কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার বলেন, ড. ইউনূস পরিকল্পিতভাবে দেশকে নতুন ধরনের উপনিবেশিক প্রভাবের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। সাংবাদিক হাসান আহমেদ অবিলম্বে হামের ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। সমাজকর্মী শাহরিয়ার নাফিস জয় বলেন, ইউনূস সরকারের অধিকাংশ কর্মকা-ই ছিল দেশবিরোধী। বিদেশি প্রভাবের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন নাট্যজন এহসানুল আজিজ বাবু, সাংবাদিক সোহেলী চৌধুরী, শান্তা ফারজানা, মোমিন মেহেদী, অভিনেতা রূপক দেহলভি ও সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম মাসুম। মানববন্ধনে উপস্থিত শাহজাহানপুরের দিনমজুর মোক্তার হোসেন বলেন, আমরা আগে হামে এত মৃত্যুর কথা শুনিনি। এখন মহামারির মতো বাড়ছে। আমার ভাতিজাও হাসপাতালে ভর্তি। টিকা কেন আনা হলো না- এর জবাব দিতে হবে। এ সময় সমাজকর্মী ফারহানা আফরোজ রুনা, নাট্য নির্মাতা রাজিব হাসান, অ্যাক্টিভিস্ট মোফাজ্জল ইসলাম রুবেল, হাসিব শেখসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধন থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- টিকা সংকট ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও বিচার, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, কোটা আন্দোলনের হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা বলেন, দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে সারাদেশে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ‘আমার শিশু মরল কেন, ইউনূস তুই জবাব দে’ এবং ‘মার্কিন গোলামি চুক্তি বাতিল করো’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।