সংবিধান ‘সংশোধন নাকি সংস্কার’ বিতর্কে উত্তাপের আভাস, সংসদীয় কমিটিতেও চমক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন

শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬

 

ঢাকা অফিস \ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে রোববার (৭ জুন)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (প্রস্তাবিত) বাজেট পরিকল্পনা করেছে সরকার। অধিবেশনে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা মূল আকর্ষণ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি নজর থাকছে ‘সংবিধান সংশোধন’ ইস্যুতে। নতুন বাজেট উত্থাপনের আগেই সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। কিন্তু ‘সংস্কার বনাম সংশোধন’ বিতর্কে আটকে আছে সেই প্রক্রিয়া। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা এখনো কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিদের নাম দেয়নি। ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে সংসদের আসন্ন অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, এই অধিবেশনেই গঠিত হতে যাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া বিএনপির সিনিয়র নেতারা এবং বিরোধী দল জামায়াতের নেতারা কে কোন কমিটির সভাপতি হচ্ছেন-তা নিয়েও চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। সংসদ নেতা তারেক রহমান মন্ত্রিসভার মতোই সংসদীয় কমিটিতেও ‘চমক’ দেবেন বলে জানা গেছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র  জানায়, চলতি সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ অধিবেশন আহ্বানের পর থেকেই এই তোড়জোড় শুরু হয়। রোববার বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ ও কার্যসূচি চূড়ান্ত করা হবে। জানা গেছে, আগামী ১১ জুন অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকার ও বিরোধী দলের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৩০ জুন পাস হবে নতুন অর্থবছরের বাজেট। বাজেট উত্থাপনের আগেই সংবিধান পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে চায় সরকারি দল। সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান রুল ২৬৬ অনুসারে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। কমিটিতে সরকারি বেঞ্চ থেকে ১২ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির ৭ জন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বিজেপি ও স্বতন্ত্র থেকে ৫ জনকে রাখা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৫ জনের নাম চাচ্ছি। তারা নাম দিলে ১৭ সদস্যের এই কমিটি গঠন করে জুলাই সনদের আলোকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। তবে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাৎক্ষণিক নাম দিতে অস্বীকৃতি জানান। তার দাবি, এখানে আমাদের কনসেপচুয়াল ডিফারেন্স (ধারণাগত পার্থক্য) আছে। আমরা চেয়েছি রিফর্ম (সংস্কার) আর সরকার চাইছে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন)। এছাড়া কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য রাখার দাবিও জানান তিনি। তবে এই দাবিকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে কোনো সদস্য দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ  বলেন, এই কমিটির সঙ্গে আমরা নীতিগতভাবে একমত নই। আর যে বিষয়ে আমরা একমতই নই, সেখানে সদস্য দেওয়ার তো কোনো সুযোগই নেই। সরকার একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করলে কী হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওনারা তো সবই পাস করতে পারে। কিন্তু তা কি টিকবে? শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল পাস করেছিলেন, শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে কেয়ারটেকার বাতিল করেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে করা এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত টেকেনি। এবারও তাই হবে। তবে সরকারি দল এখনো আশাবাদী। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন  বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে সবাইকে নিয়ে সংসদকে আরও অর্থবহ করতে চায় সরকারি দল। আমরা আগামী সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ২০১০ সালের কথা। নবম সংসদে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি নাম না দেওয়ায় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে একতরফা বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সুপারিশেই বাতিল হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। এবার বিরোধী দল নাম না দিলে আবারও সেই একতরফা প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সংবিধান বিতর্কের পাশাপাশি এই অধিবেশনে সবার নজর থাকবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের দিকে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের নিয়ে ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হবে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত। সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের নির্ধারিত কোনো পদমর্যাদা না থাকলেও সংসদ ভবনে সরকারিভাবে একটি অফিস পেয়ে থাকেন। এর বাইরে সিনিয়র সহকারী সচিব অথবা উপসচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব (পিএস) ও একজন অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর এবং অফিসে আপ্যায়ন খরচ বাবদ ১২ হাজার টাকা মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া গাড়িতে সংসদের পতাকা ওড়াতে পারেন। জানা গেছে, রোববার থেকে এই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সাধারণত সাবেক মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতারা, যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি, তাদের এসব কমিটির সভাপতি করা হয়। এবার নির্বাচিতদের অধিকাংশই নতুন। তাই কমিটিতে সিনিয়রদের পাশাপাশি নতুনদেরও জায়গা দেওয়া হবে। অর্থ বা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ড. আব্দুল মঈন খান, স্বাস্থ্য বা জ্বালানিতে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পরিবেশ ও জলবায়ুতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শিক্ষায় ড. ওসমান ফারুক, স্বরাষ্ট্রে লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আইনে জয়নুল আবেদীনের নাম সভাপতি হিসেবে জোর আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে আজিজুল বারী হেলাল, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থের নামও সভাপতি হিসেবে শোনা যাচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবার বিরোধী দল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৪টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো-সরকারি হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান, অনুমিত হিসাব ও বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। আনুপাতিক হারে এর বাইরে আরও ৬টি কমিটি পেতে পারে জামায়াত জোট। জামায়াত জোট থেকে সভাপতি হিসেবে শাহজাহান চৌধুরী, জি এম নজরুল ইসলাম, এটিএম আজহারুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম খান ও এনসিপির আকতার হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হুইপ  জানান, মন্ত্রিসভা ও স্পিকার নির্বাচনের মতো সংসদীয় কমিটির সভাপতি মনোনয়নেও সংসদ নেতা তারেক রহমান বড় ধরনের চমক দেবেন। সংসদের ভারসাম্য রক্ষায় বিরোধী দল ও স্বতন্ত্রদের মধ্যে যারা দক্ষ, তাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। সব মিলিয়ে, বাজেট পাসের উত্তেজনার পাশাপাশি ‘সংবিধানের ভবিষ্যৎ’ এবং ‘সংসদীয় ক্ষমতার বণ্টন’ নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন যে দেশের রাজনীতির একটি নতুন বাঁক তৈরি করতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।