কুমারখালী প্রতিনিধি \ ‘নামাজ পড়ে আসে দেখি ভ্যানডা নাই। চারদিন ধরে চেয়ারম্যান, নেতা, থানা, পুলিশ ঘুরতেছি। কোনো লাভ হচ্ছেনা। ভ্যানটুকুর ওপরই সংসার চলত। বাড়িতে চালডা আছে। তরকারি নাই। এহন পান্তা খাচ্ছি। আমি অসুস্থ, বউডা অসুস্থ। বৃদ্ধ মা অসুস্থ। একদিন পরপর ১২০ টাহার ওষুধ লাগে। টেনশনে দেহমেহ শুকো যাচ্ছে।’ আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন মো. মোশারফ হোসেন (৬১)। গতকাল শনিবার (৬ জুন) সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা চত্বরে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাঁর। তিনি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া এলাকার মৃত মোন্তাজ সেখের ভ্যানচালক ছেলে। ২ জুন উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদ চত্বরে উপার্জনের একমাত্র ভ্যানটি রেখে মাগরিবের নামাজ পড়তে গিয়েছিল মোশারফ। নামাজ শেষে এসে দেখেন তাঁর ভ্যানটি আর নেই। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। সম্ভাব্য স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটি না পেয়ে ৩ জুন থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর সংসারে স্ত্রী আলেয়া খাতুন (৫০), বৃদ্ধ মা নবিরন নেছা ও এক বেকার ছেলে আলামিন আছেন। মোশারফের ভাষ্য, তিন বছর আগে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ পাঁ ভেঙে তিনি গুরুতর আহত হন। এক পাঁয়ে ভর করে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলাচল করেন তিনি। ভ্যান চালানো ছাড়া অন্যকাজ করতে পারেন না। প্রতিদিন ভ্যানচালিয়ে ৫০০- ৬০০ টাকা আয় হয়। তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার। তবে ভ্যান হারিয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার খয়েরচারা বাজার – ফুলতলা সড়ক ঘেঁষে টিনশেডের জরাজীর্ণ চারচালা দুই কক্ষবিশিষ্ট টিনের ঘরে বাস মোশারফের। একটি কক্ষে অসুস্থ মা ও স্ত্রীকে নিয়ে বিলাপ করছেন মোশারফ। তাদের চোখেমুখে হতাশা। এ সময় মোশারফ বলেন, ‘আনি খায়। বাড়িওয়ালাও রোগী। আমিও রোগী। টাকার অভাবে আমি ওষুধ খায়না। এহন একটা ভ্যান হলে কর্ম করে খাতাম।’ বৃদ্ধ মা নবিরন বলেন, ‘নামাজ পড়তে বয়ছে। এসে দেখে ভ্যান নাই। কান্তি কান্তি আজ কয়ডা দিন মরতেছে। সমস্যা হচ্ছে। ভ্যানেতেই কামই খায়। সদায় ( বাজার) করে। সংসার চলে। এক্সিডেন্টে পা ডা ভাঙা। ভ্যান ছাড়া কিছুই পারেনা। একটা ভ্যান হলিই ভালো হয়।’ আমি স্ট্রোক করিছি দুইবার। শ্বাশুড়ির মাঝা ভাঙা। আজ কয়দিন ওষুধ খাতি পারতিছিনে। বাজার খাতি পারতিছিনে। ওর ( ভ্যান) পরই নির্ভর আমার। ভ্যান চালা কয়ডা ওষধ মষধ আনে দিত তাই খায়। ভ্যানডা চুরির পর তা আর পারতেছেনা। ওই চাল আছে। তাই নুন পানি দে খায়। সকলে মিলে একটি গাড়ি দেন।’ কথাগুলো বলছিলেন চালকের স্ত্রী আলেয়া খাতুন। প্রতিবেশী মো. পান্না বলেন, ভ্যান হারিয়ে মোশারফ পরিবার নিয়ে খুব অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নতুন ভ্যান কেনার সামর্থ্য নেই। সরকার একটি ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিলে পরিবারটি খেয়েপরে বাঁচতে পারবে। জোতমোড়া বড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম, সেদিন মাগরিব নামাজের সময় ভ্যানটি চুরির ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফ্রুটেজে সে দৃশ্য ধারণ আছে। তবে চোরকে চেনা যাচ্ছেনা। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সাধ্যমত সহযোগীতা করা হবে। কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, খোঁজখবর নিয়ে সাধ্যমত সহযোগীতা করা হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
