নূরজাহান বেগমের লাশ কি বদলাবে আইন আর বিবেক?

প্রবীণদের নীরব আর্তনাদ

শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬

 

 

মনজুর এহসান চৌধুরী :

ঢাকার মিরপুরে ৭৫ বছরের নূরজাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশে বয়স্ক মা- বাবার প্রতি অবহেলা ও নির্যাতন নিয়ে নতুন করে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। কয়েক দিন আগে তার মৃত্যু হলেও বাসার ভেতরে লাশ পচে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শুধু ব্যক্তিগত ট্র?্যাজেডি নয়; এটি এক ধরনের নীরব নির্যাতন, যেখানে সন্তানেরা নৈতিক দায়িত্ব তো বটেই, রাষ্ট্রীয় আইনের চোখেও জবাবদিহির আওতায় পড়তে পারে—যদি আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়।

ভারতে ঠিক এই ধরনের প্রবীণ নির্যাতন ও অবহেলা ঠেকাতে ২০০৭ সালে প্রণয়ন করা হয় “Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007” নামের একটি বিশেষ আইন। এই আইনে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও উত্তরাধিকারীদের জন্য বাবা-মা ও প্রবীণ আত্মীয়দের ভরণপোষণ আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাবা-মা চাইলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে মাসিক ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন, আর সন্তান সেই ভরণপোষণ না দিলে জরিমানা এবং তিন মাস পর্যন্ত কারাদন্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। এমনকি ট্রাইব্যুনাল দ্রুত সময়ে (সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে) মামলার নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতাও দিয়েছে আইনটি।

বাংলাদেশেও “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” নামে একটি আইন আছে, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে—প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে, তাদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, দেখাশোনা এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। এই আইন ভঙ্গ করলে সন্তানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদন্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ গ্রহণ, মামলা পরিচালনা, দ্রুত বিচার ও উদাহরণযোগ্য শাস্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা থাকায় বেশির ভাগ প্রবীণই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না বা নেন না।

নূরজাহান বেগমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষজ্ঞদের মত, এখানে শুধু প্রশাসনিকভাবে একজন যুগ্ম সচিবকে সাময়িক বরখাস্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ভারতের আইন যেভাবে আলাদা ট্রাইব্যুনাল, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে সন্তানের ওপর আইনি চাপ তৈরি করেছে, বাংলাদেশেও সেই ধাঁচে প্রবীণ নির্যাতন-বিষয়ক আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও প্রক্রিয়াগত সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।

সমাধানের পথে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি স্পষ্ট প্রস্তাব করছেন—

*     বয়স্ক পিতা-মাতার জন্য আলাদা ও সহজলভ্য অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল চালু করা।

*     “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩”-এর ব্যাপক প্রচার, যেন প্রবীণরা নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন এবং প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন।

*     ভারতের মতো প্রবীণদের জন্য হেল্পলাইন ও আইনি সহায়তা সেল চালু করে সন্তানদের অবহেলা ও নির্যাতনকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দৃশ্যমানভাবে বিচার করা।

নূরজাহান বেগমের মৃত্যু তাই কেবল এক মায়ের নিঃসঙ্গ পরিণতি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে সিস্টেম বদলের জরুরি বার্তা। যদি এখনই প্রবীণদের সুরক্ষায় কঠোর, কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই নীরব নির্যাতন আরও অনেক অচেনা নূরজাহানদের গিলে খাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

০৩.০৬.২০২৬