সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে মাদক কারবার, চোরাচালান এবং বিপণনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ত থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। একসময় মাদক কারবারে নারীদের উপস্থিতি চিন্তাই করা যেত না, সেখানে এখন মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা, এমনকি নারীদের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুর জেলার মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন আটজন নারী। বরিশাল বিভাগে নারী কারবারি আগের চেয়ে বেড়েছে তিন গুণের বেশি। চট্টগ্রাম ও নারায়ণঞ্জেও মাদক চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন নারীরা। সারা দেশেই মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল—সর্বত্র সহজেই মিলছে প্রাণঘাতী সব মাদক। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। রাজধানীসহ অনেক শহরেই প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বেচাকেনা। খবরে বলা হয়েছে, গাজীপুরের টঙ্গীতে হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদনগরসহ সেখানকার বস্তিগুলো দেশের অন্যতম মাদকের হাট হয়ে উঠেছে। এসব এলাকায় বস্তির খুপরিতে প্রতিদিন বড় অঙ্কের মাদক বেচাকেনা হয়। জানা গেছে, এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পাঁচ নারীর হাতে। এসব নারী প্রথমে গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করলেও এখন ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক নিয়েই তাঁদের কারবার। প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজনের নাম-পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। জানা গেছে, মাদক কারবার করে তাঁরা অঢেল সম্পদ বানিয়েছেন। তবে কোটি টাকার বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হওয়ার পরও এখনো বস্তির আস্তানা ছাড়েননি। এসব নারী মাদক কারবারির বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। এমনকি গ্রেপ্তারও হয়েছেন বেশ কয়েকবার। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়েন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে বরিশাল বিভাগে চিহ্নিত নারী মাদক কারবারি ছিলেন মাত্র ১৬ জন। তবে এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে বরিশাল বিভাগে মাদক কারবারির সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরিশালে ৩৮ জন। শুধু গাজীপুর, বরিশালই নয়, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের আরো অনেক জায়গায়ই এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বরিশাল জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক তানভীর হোসেন খান বলেন, ‘এই নারী মাদক কারবারিরা বরিশালে চিহ্নিত। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা রয়েছে।’ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি বলেছেন, মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হলেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা যায় না। দেখা যাচ্ছে, মাদকের হটস্পট এবং মাদকের মূল হোতা—কোনোটিই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অজানা নয়। বলা হচ্ছে, অভিযানও চালানো হচ্ছে। সংগত কারণে প্রশ্ন আসে, তাহলে সমাজে মাদকের এত বিস্তার হলো কী করে? সরকার বলছে, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করা হবে। আমরাও মনে করি, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব মাদক কারবারি চিহ্নিত, তাঁদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন তাঁরা পুনরায় এই কাজে না জড়াতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের সংশোধন প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও ভাবার দরকার আছে।