রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ যখন নতুন ভোরের প্রত্যাশা করছে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পেশাদারত্ব ও শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ ওঠার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনে এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট ও তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিবেদনে বদলি বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ‘চেইন অফ কমান্ড’ যদি ভেঙে পড়ে এবং জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না হয়ে অর্থ লেনদেন ও তোষামোদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কীভাবে সম্ভব কোনো কর্মকর্তা যদি বিপুল অঙ্কের ঘুস দিয়ে একটি থানার ওসি বা জেলার এসপি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে তার প্রাথমিক লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বিনিয়োগ করা টাকা যে কোনো উপায়ে উঠিয়ে নেওয়া। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন বা জনসেবা নিশ্চিত করা তার কাছে গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসব কারণেই মাঠপর্যায়ে ‘মব কালচার’ দমনে পুলিশ কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এছাড়া শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে গোপন বদলি বাণিজ্যের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড এবং ‘চাকরিকে ব্যবসা’ বলে মন্তব্য করার ঘটনা পুরো বাহিনীর পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নিয়োগ ও পদোন্নতির বিধিমালা (পিআরবি) ইচ্ছামতো সংশোধন করে নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করা মাঠপর্যায়ে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে দিচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে যেভাবে অনেককে বঞ্চিত করা হয়েছিল, বর্তমানেও যদি একই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্য পদোন্নতি আটকে বাণিজ্য শুরু হয় এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়, তাহলে সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে পুলিশ প্রশাসনে বদলি বাণিজ্য বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রয়োগ করা জরুরি। পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি চলবে না; মেধা ও যোগ্যতাকেই অন্যতম মাপকাঠি করতে হবে। চেইন অফ কমান্ড পুনর্বহাল এবং অনিয়মে জড়িতদের শাস্তির আওতায় এনে পুলিশকে একটি সত্যিকারের স্বাধীন, জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা এ মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি কাজ।