নিজ সংবাদ \ কুষ্টিয়া শহরের রাজার হাট মোড়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী খামারবাড়ি প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ফল মেলা। রঙিন বেলুন, ফুলের সাজসজ্জা আর কৃষকদের উৎসাহী ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। গতকাল মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ মেলা প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ তৌহিদ বিন-হাসান। ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি সকালে জমকালো আয়োজনের মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হয়। মেলায় দেশীয় মৌসুমি ফলের নানা জাতের প্রদর্শনী, উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি, নিরাপদ ফল উৎপাদন পদ্ধতি এবং আধুনিক ফলচাষের তথ্য-পরামর্শসহ নানা আকর্ষণ স্থান পেয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন- “ভোক্তা পর্যায়ে বিষমুক্ত ফল পৌঁছে দিতে হলে প্রোপার ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষিকে বিশেষ একটি সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মানসম্পন্ন ও বিষমুক্ত ফল পৌঁছে দেয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপনন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে কার করছে। আমরা আশা করি নিরাপদ ফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে”। অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রতিটি মানুষের ন্যুনতম ১০০ গ্রাম ফলের পুষ্টি প্রয়োজন।

সেই পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং ফল সহজলভ্য করতেই এই আয়োজন। যাতে করে মানুষের কাছে পুষ্টিকর ফলগুলো স্বল্প মূল্যে পৌঁছে দেয়া যায়, সেজন্য আমাদের সকলের চেষ্টা থাকবে”। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল প্রণব কুমার সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কৃষি বিভাগের প্রতিনিধি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কৃষক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ। সকলের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলের চারা বিতরণ করা হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ফলচাষ ও পরিবেশ সুরক্ষায় আগ্রহী করে তোলার অনন্য উদ্যোগ। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালি খাতুন বলেন, “কৃষকরা সব করতে পারেন। আমরা শুধু তাদেরকে সহযোগিতা করবো। আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে একজন কৃষককে দেখে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হন। কৃষকদের সাফল্যই আমাদের সাফল্য।” জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সোহেল জানান, “এই ফল মেলা মূলত চাষীদের বিদেশি ফল নিজ দেশে চাষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে আমরা বিদেশি ফলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। অথচ দেশে বিদেশি ফল যেমন ড্রাগন, আপেল, কিউই ইত্যাদি উৎপাদন করতে পারলে আমাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।” উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, “আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশি ফলগুলো নিরাপদে, বিষমুক্তভাবে চাষ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। সঠিক প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।” ড্রাগন ফল চাষি হাবিবুর রহমান তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরে ড্রাগন ফল চাষ করছি। কিন্তু প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফলগুলো ৫-৭ দিনের মধ্যে একবারে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে বাজারজাতকরণে সমস্যা হয় এবং ভালো দাম পাওয়া যায় না। যদি সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আমরা কৃষকরা অনেক বেশি লাভবান হবো।” কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শওকত হোসেন ভুঁইয়া জানান, “আমরা কৃষকদের ছাদবাগান, বাড়ির আঙিনায় ফলচাষ এবং নিরাপদ উৎপাদনের প্রতি বেশি উদ্বুদ্ধ করছি। ছাদবাগান শুধু পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে না, বরং শারীরিক ব্যায়ামেরও সুযোগ করে দেয়। দেশীয় ফলের উৎপাদন ও ভোগ বাড়াতে প্রতিবছরের মতো এবারও এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।” এ মেলার মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরাপদ চাষ পদ্ধতি প্রচার, মৌসুমি ফলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফলচাষে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফল খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ মেলা কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে, ফলচাষে বাণিজ্যিক আগ্রহ বাড়াবে এবং সামগ্রিকভাবে কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিন দিনব্যাপী এ মেলায় প্রতিদিন বিশেষ আলোচনা সভা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কৃষক, উদ্যোক্তা ও নগরবাসীর ব্যাপক অংশগ্রহণে মেলাটি সফল হবে বলে আশা করা যায়।
