আফসানা ইসলাম পুষ্প ॥ তারুণ্যের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করে সুন্দর আগামী গড়ার প্রত্যয়ে কুষ্টিয়ায় পালিত হয়েছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬। গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) জেলা প্রশাসন ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আয়োজনে আলোচনা সভা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (উপসচিব) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম। তিনি বলেন, “একজন কিশোরের লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সুব্যবস্থা যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারবো। তথ্য-প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের আগামীতে বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা যদি আমাদের এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের কাছে এটাই প্রতীয়মান হবে, আমাদের এই জনসংখ্যা রাষ্ট্রের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বোঝা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সবাইকে তথ্য-প্রযুক্তি সংবলিত জ্ঞানে নিজেদেরকে আপডেট করতে হবে”। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার, সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিকদার মো. হাসান ইমাম। কুতুব উদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, “জনসংখ্যা সম্পর্কে বাংলাদেশের সব পরিবারই এখন সচেতন। আর আমাদের জনসংখ্যাকে আমরা এখন আমাদের সম্পদ হিসেবেই চিহ্নিত করি। আমাদের রিসোর্স বাড়ছে। বৈশ্বিক রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্নমুখী হওয়ার একটা সম্ভাবনা বাড়ছে। সুতরাং আমাদের বর্তমান জনসংখ্যা আমাদের কাছে এখন আর বোঝ্ ানয়। তবে এই সমগ্র জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার”। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, “পৃথিবীতে যারাই নিজেদের জনসংখ্যা কমানোর চেষ্টা করেছে, তারাই বিপদে পড়েছে। একসময় চীন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বাধ্যমে এক সন্তান বিশিষ্ট পরিবার গঠনের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু এখন চীন ইল্টো পথে হাঁটছে। যে পরিবার যত সন্তান নিচ্ছে, তাদেরকে তত পুরস্কৃত করা হচ্ছে। জাপানের জনসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। এই হ্রাস প্রক্রিয়া যেভাবে চলমান রয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে এই শতাব্দীর শেষে জাপানের জনসংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে। একই চিত্র রাশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ারও। তাই আগে যে ধারণা ছিলো, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সেই ধারণা এখন আর বলবৎ নেই। এখন আমাদের শিশুদেরকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে যদি সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তবেই আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারবো”। সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, “জনসংখ্যার কথা উঠলেই আমরা চিন্তা করি কিভাবে আমরা এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করবো। বিষয়টি একসময় বিশ্বের অনেক দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও বলবৎ ছিলো। এখন আর সেই ধারণা নেই। জনসংখ্যা নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা নয়। এটি আসলে সম্পদ, কারণ আমাদের জনসংখ্যা না থাকলে আমরা কিভাবে কাজ করবো তাই এখন আর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়। এখন আমাদের জনসংখ্যাকে কিভাবে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব সেদিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি নৈতিকভাবে সুশিক্ষিত একটি জাতি গড়ে তুলতে পারি, তাহলে জনসংখ্যা কোন সমস্যা নয়”। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিকদার মো. হাসান ইমাম বলেন, “জনসংখ্যাকে যদি আমরা জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তবে সেই জনসংখ্যা আমাদের জন্য একটি সম্পদে পরিণত হবে। আমাদের বৈদেশিক আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বর্তমানে রেমিট্যান্স। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, আমাদের শিশুদের যদি আমরা একাধিক ভাষা শেখাতে পারি, তাহলে আমরা ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে পারবো। কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তিকে যদি আমরা বিদেশে বিভিন্ন কাজে লাগাতে পারি, তাহলে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব”। বক্তারা বলেন, জনসংখ্যাকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। পাশাপাশি জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। শেষে বার্ষিক কার্যক্রমের মূল্যায়নের ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনসংখ্যা কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে এমন উদ্যোগ জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
