তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর

বাংলাদেশ-চীন-মালয়েশিয়া: নতুন কৌশলগত যুগে বন্ধুত্ব ও প্রাপ্তির সাম্প্রতিক চিত্র

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

 

 

 

নিজ সংবাদ \ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় তুলে এনেছে। চীন সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে উন্নীত করে দুই দেশ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি বিস্তৃত ব্লুপ্রিন্ট নির্ধারণ করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। একই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও ট্রেড-সম্পর্কে একগুচ্ছ সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথা উঠে এসেছে, যার মাধ্যমে সম্পর্ককে বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়েছে। এতে ট্রেড গ্যাপ কমিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি, চীনা ফ্যাক্টরিগুলো বাংলাদেশে রিলোকেশন করে শ্রমঘন শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আনোয়ারা ও মংলা ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও আঞ্চলিক হাব হিসেবে উন্নীত করা এবং মংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে সার্ভিস-অরিয়েন্টেড বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে চীনের আগ্রহ ও আশ্বাস বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

 

বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস এই সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা, ফিজিবিলিটি স্টাডি, টেকনিক্যাল সহায়তা এবং ডিজাইন থেকে এক্সিকিউশন—পুরো প্রক্রিয়ায় চীন যুক্ত থাকবে বলে যে রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, তা উত্তরাঞ্চলকে ঘিরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও পরিবেশ-নিরাপত্তায় একটি বাস্তবসম্মত আশার আলো দেখাচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চীনের সহায়তা অব্যাহত রাখার আগ্রহ বাংলাদেশের আর্থিক ও শিল্পখাতকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুধু অর্থনীতি ও অবকাঠামো নয়, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও চীন সফর নতুন দিগন্ত খুলেছে। বাংলাদেশে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিনকে প্রাধান্য দেওয়া, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষায় চীনা অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং স্বাস্থ্যখাতে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রোবটিক সার্জারি প্রযুক্তি আনয়নের বিষয়ে আলোচনাগুলো ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ নিতে পারে। এশিয়ান পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে এই ধরনের শিক্ষা-স্বাস্থ্য সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

কূটনীতির আরেকটিমাত্রায় এই সফর রোহিঙ্গা ইস্যুকে নতুনভাবে আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে এনেছে। বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপ ফ্যাসিলিটেট করতে চীন আগ্রহী থাকার বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-চীন ‘টু প্লাস টু’ আন্ডারস্ট্যান্ডিং (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ের যৌথ সংলাপ কাঠামো) গড়ে ওঠায় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র সহযোগিতায় একটি কাঠামোগত স্তর যুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্রিকস প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে চীনের ইতিবাচক মনোভাবও এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

অন্যদিকে মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি প্রধানত শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমবাজারের অন্যতম গন্তব্য হলেও নানা জটিলতায় তা বারবার ভাটা পড়েছে। এবার দুই দেশের আলোচনায় দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তিকে নতুন সেক্টরে পাঠানো, শ্রমিকদের আইনগত সুরক্ষা জোরদার করা এবং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে যে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে লাখো প্রবাসী শ্রমিকের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। অবৈধ পথে শ্রম অভিবাসন কমিয়ে দুই দেশের অভিবাসন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার যে ইচ্ছা প্রকাশ হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।

মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর আলোচনাও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে পারে। দ্বিপাক্ষিক ট্রেড বাড়াতে ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা কমানো, আইসিটি ও ডিজিটাল ইকোনমিতে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ এবং মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্কলারশিপ ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা শিক্ষিত তরুণ ও পেশাজীবীদের জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে। পর্যটন, সংস্কৃতি ও মিডিয়া এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে যৌথ প্রচারণা ও বিনিময় কর্মসূচি চালুর ধারণা দুই দেশের জনগণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ও বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক হবে।

চীন ও মালয়েশিয়া—দুই দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক এ সফরগুলোকে একত্রে দেখলে বাংলাদেশের জন্য একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের উচ্চতর স্তরে উন্নীত হচ্ছে; অন্যদিকে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্ক শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও জন সংযোগের নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। দুই দেশের সঙ্গে এ ধরনের বহুমাত্রিক সহযোগিতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলবে—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।