কুমারখালী প্রতিনিধি \ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বালুঘাটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরিফুল ইসলাম (৪৩) নামের এক ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ফাঁকা গুলি বর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের লালন বাজারে এঘটনা ঘটে। এছাড়াও রাত ১২টার ওই ব্যবসায়ী আরিফুল, তাঁর বড় ভাই রবিউল ইসলাম ও চাচাতো ভাই সামছুল ইসলামের বাড়িতে ফাঁকা গুলি বর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আরিফুল যদুবয়রা ইউনিয়নের হাঁসদিয়া গ্রামের মৃত সাদেক আলীর ছেলে। বর্তমানে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত আরিফুল বলেন, ‘টাকা প্রদানের শর্তে আমার ভাটার ওপর দিয়ে বালুর গাড়ি চলাচল করে। ঘাটে আমার একটি ভেকুও চলে। ঘাটের কাছে কিছু টাকা পাওনা আছে। শুক্রবার সকালে টাকা চাইতে গিয়ে বিএনপি নেতাদের নিয়ে ইয়ার্কিমূলকভাবে কিছু কটুক্তি কথা বলেছিলাম। হয়তো সেজন্যই রাতে সুজন ও রিশানরা হামলা চালিয়েছে। এদিন রাত দেড়টার দিকে যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসবক দলের সভাপতি রিপন আলীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ এবং বহুতল বিশিষ্ট বাসভবনের গেট, সিসিটিভি ও কাঁচের জানালায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তিনি চৌরঙ্গী বাজার এলাকার বাসিন্দা। জানা গেছে, ২০২৩ সালে এলংগী আচার্য মৌজায় গড়াই নদীর ড্রেজিংকৃত প্রায় ৭০ হাজার হাজার ঘনফুট বালু প্রায় ৭০ লাখ টাকায় ইজারা দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে টেন্ডারের মাধ্যমে বালু অপসারণের দায়িত্ব পায় কুষ্টিয়ার সৈকত এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতন এবং বালু অপসারণের যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না থাকায় ঠিকাদার বালু তুলতে পারে না। সম্প্রতি ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে এবং উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় সাবেক কলেজ ছাত্রদল নেতা সুজন হোসেন, যদুবয়রা ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক রিপন হোসেন ও তাঁদের সহযোগীরা বালুর ব্যবসা করছেন। বালুর গাড়িগুলো টাকা প্রদানের শর্তে ব্যবসায়ী আরিফুলের জমির ওপর দিয়ে চলাচল করছে। সেই পাওনা টাকার জেরে আরিফুলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আরও জানা গেছে, সম্প্রতি বালুর ঘাটটি ঠিকাদারের কাছ থেকে চুক্তি সাপেক্ষে দখল নিতে চান যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন আলী। এ নিয়ে গত শুক্রবার সকালে বালুঘাটের কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রদল নেতা সুজনের সঙ্গে রিপনের হাতাহাতি হয়। এসব নিয়ে উত্তেজনা চলছিল। এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে রিপনের বাড়িকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, লালনবাজার এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কিত। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। পড়ে আছে গুলির খোঁসা। এ সময় আহত আরিফুলের ভাতিজা মাহবুবুল হাসান রনি বলেন- ‘সুজন, রিপন, রিশানসহ অনেকেই রাতে হঠাৎ চাচার ওপর হামলা চালিয়ে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরতর আহত করে এবং ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে চলে যায়। মুদি দোকানী জহুরুল ইসলাম বলেন, বালুর ঘাট নিয়ে প্রায় হামলা ও গুলাগুলির ঘটনা ঘটছে। গতকাল রাতেও গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। তিনি বালুর ঘাট বন্ধের দাবি জানান। এদিকে কয়েকটি বাড়িতে মোটরসাইকেলে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, কয়েকটি মোটরসাইকেল মুখবাঁধা কয়েকজন মানুষ অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। তাঁদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। সরেজমিন দেখা যায়, হাঁসদিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের বাড়ির প্রবেশপথের দেওয়ালে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র। এসময় রবিউল ইসলাম বলেন, প্রথমে বাজারে আমার ছোট ভাইকে মারেছে। পরে বাড়িতে এসে ৮ – ১০ টা গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। সিসিটিভিতে সব দেখা যাচ্ছে। থানায় মামলা করা হবে। সরেজমিন দেখা যায়, এলংগী মৌজায় আহত আরিফুলের ইটের ভাটা রয়েছে। ভাটার ওপর দিয়ে গড়াই নদীর ড্রেজিংকৃত বালু অপসারণ করা বালু বিভিন্ন যানবাহনে নেওয়া হচ্ছে অন্যত্রে। এ সময় সৈকত এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক অনু শেখ বলেন, বিভিন্ন কারণে ঘাট বন্ধ ছিল। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পারসেন্ট ভাগ করে ২০ -২৫ দিন হলো ঘাট চলছে। কারা হামলা ও গুলি করেছে তা জানা নেই। তাঁর ভাষ্য, প্রতিদিনই আরিফুলদের পাওনা ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়ে থাকে। সরেজমিন দেখা যায়, স্বেচ্ছাসবক দল নেতা রিপন আলীর বাড়ির গেট, সিসিটিভি জানালার গ্লাস ভাঙা। আতঙ্কিত স্থানীয়রা। এ সময় রিপন আলী বলেন, বালু ঘাটকে কেন্দ্র একজন বড় বিএনপি নেতার নির্দেশে বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও ২০ -২৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। এছাড়াও অ্যাপাচি আরটিআর মডেলের মোটরসাইকেলটি নিয়ে গেছেন সন্ত্রাসীরা। থানায় মামলা করা হবে। সরেজমিন দেখা যায়, ছাত্রদল নেতা সুজন হোসেন বাড়িতে নেই। সেজন্য তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যদুবয়রা ইউনিয়ন য্বুদলের যুগ্ম আহবায়ক রিপন হোসেন বলেন, বৈধভাবে ঘাট চালানো হচ্ছে। তবে কারা কেন হামলা চালিয়েছে তা জানা নেই। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান বলেন- বালুঘাট, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারা জড়িত তা প্রশাসন খুঁজে বের করুক। কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ঘটনা এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
