দুর্নীতি, জনবল সংকট ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু প্রসঙ্গে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হানের খোলামেলা সাক্ষাৎকার

পরিবর্তনের পথে কুষ্টিয়ার স্বাস্থ্যসেবা

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

 

 

 

স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার, কিন্তু বাস্তবে এই সেবার মান ও প্রাপ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। কুষ্টিয়া জেলা ও বৃহত্তর এলাকার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট, দুর্নীতি ও পরিকল্পনার ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যখাতে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ, বাজেট বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত চালু করার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (প্রশাসন)প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান।

এ সাক্ষাৎকারে আরও অংশ নিয়েছেন কুষ্টিয়া ২৫০ সজ্জা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নবাগত তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ. এইচ. এম. আনোয়ারুল ইসলাম এবং সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মন্নান। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের প্রাঙ্গণে, আন্দোলনের বাজার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সিনিয়র রিপোর্টার তরিকুল ইসলাম।

 

কুষ্টিয়ার সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা : প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হানের মূল্যায়ন

প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—দু’টিই খুব বড় স্থাপনা কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ, বিশাল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এত বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও এগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চলমান রাখা যায়নি, যার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি দুর্নীতি ও পরিকল্পনার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেন। তার ভাষায়, “আমাদের এক্সিস্টিং যে হসপিটালগুলো আছে, এগুলো অপটিমাম পর্যায়ে ফাংশনিং করতে পারিনি—বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি এবং প্রপার প্ল্যানিংয়ের অভাবের কারণে। এখনো শতভাগ ফাংশনিং সম্ভব হয়নি।” তিনি বলেন, যদি দুইটি কাজ নিশ্চিত করা যায়—দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, অর্থ ব্যয়ের শতভাগ স্বচ্ছতা এবং বিদ্যমান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো—তাহলে সীমিত সম্পদ ও ম্যানপাওয়ার দিয়েও কুষ্টিয়াসহ দেশের জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে অনেক ভালো পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।

চিকিৎসক ও নার্স সংকট: সমাধানের সরকারি পরিকল্পনা

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে—এ বিষয়ে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, চিকিৎসক সংকট একটি “প্রতিষ্ঠিত সংকট”, কিন্তু এ নিয়ে খুব একটা খোলাখুলি আলোচনা হয় না। তিনি জানান, একজন সরকারি ডাক্তার বাস্তবে নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময়, প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সেবা দিয়ে থাকেন, তবু রোগীর চাপ ও বেডের অতিরিক্ত ব্যবহার (২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল বাস্তবে ৬০০- ৮০০ রোগী ধারণ করছে) সেবার মান কমিয়ে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রায় ৫০০০ এমবিবিএস ডাক্তার এবং ৩০০ বিডিএস ডেন্টাল সার্জন নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে, পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে ১ লাখ মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি এটিকে স্বাস্থ্যখাতে একটি “বুমিং ডিসিশন” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত মাঠ পর্যায়ের জনবলকে একীভূত করে ওভারল্যাপিং কমিয়ে সেবা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু একজন মেডিসিন বা সার্জারি বিশেষজ্ঞকে বসিয়ে দিলেই হবে না, তার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা—ওটি, প্রি-অপারেটিভ ও পোস্ট-অপারেটিভ ম্যানেজমেন্ট, রোগীর ধারাবাহিক সেবা—সবকিছু থাকতে হবে। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে জেলা সদরে বিশেষজ্ঞদের বসিয়ে সপ্তাহের কিছু দিন উপজেলায় সার্ভিস দেওয়ার মাধ্যমে দুই পক্ষের রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান জানান, অন্যতম বড় বাধা ছিল সেনাবাহিনীর ডেপ্লয়মেন্ট— হাসপাতালের জায়গা পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে সেনাবাহিনী তাদের অবস্থান তুলে নেওয়ায় পুরো জায়গা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে এসেছে, ফলে হাসপাতাল চালুর বাস্তব প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইমারজেন্সি সার্ভিস চালু করতে হলে ন্যূনতম ১২- ১৬ জন ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে একজনও নেই। এজন্য খুলনা বিভাগে সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করে মেডিকেল অফিসারদের পুনর্বিন্যাস (রিডিস্ট্রিবিউশন) করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে কুষ্টিয়ার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল জোগাড় করা যায়।

তিনি জানান, হাসপাতালে ১৫টি ওটি (অপারেশন থিয়েটার) ফাংশনাল করার লক্ষ্যে কাজ চলছে; জনবল যতটুকু আছে, তা দিয়ে ধীরে ধীরে সার্জারি শুরু করা হবে। তার আশা, এক-দুই মাসের মধ্যে ওটিগুলো চালু হলে রোগীর সংখ্যা ও বেড অকুপেন্সি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে, এবং ইমারজেন্সি বিভাগে মেডিকেল অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে রোগী সরাসরি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবে।

মন্ত্রী মহোদয় যে তিন মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে উদ্বোধনের কথা বলেছেন, সে প্রসঙ্গে তিনি বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন—যদি হাসপাতালকে “মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ রূপে” চালু করা না যায়, তবে শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অর্থবহ হবে না। এ কারণে তিনি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর সার্ভিস চালু করার চাপে আছেন বলে উল্লেখ করেন।

অবৈধ ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও দালালচক্র

অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে মাননীয় মন্ত্রীর নির্দেশনার পরও দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাবের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান জানান, সিভিল সার্জন কুষ্টিয়ায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন—কিছু ক্লিনিক পুরোপুরি বন্ধ, কিছু আংশিক বন্ধ এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ (অবজারভেশন) দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা এখন অনেক কঠিন; পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় ছোট পরিসরের ক্লিনিক মালিকদের পক্ষে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা বাস্তবিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ২০২৩ সালের পর থেকে প্রায় কোনো ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি, যদিও মালিকরা আবেদন করে রেখেছেন।

একই বিল্ডিংয়ে সাধারণ ক্লিনিক ও চক্ষু ক্লিনিকের ওটি পরিচালনার বিষয়ে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন, চোখের ওটি এবং ইমপ্লান্টেশন সংক্রান্ত সার্জারির ওটি— for example অর্থোপেডিক্স বা স্পাইন সার্জারি—এসবের জন্য আলাদা, উচ্চমানের স্টেরাইল পরিবেশ থাকা বাধ্যতামূলক। এ ধরনের মান বজায় না থাকলে আংশিক বন্ধ, পর্যবেক্ষণ, এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধন না হলে সম্পূর্ণ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দালাল বা ব্রোকারদের মাধ্যমে রোগী সরকারি হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্রোকার রোগীকে সরাসরি বাড়ি থেকে টেনে নেয় না, রোগী আগে সরকারি হাসপাতালে আসে, তারপর সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে ক্লিনিকে যায়। তিনি পরিষ্কার মন্তব্য করেন—ডাক্তার যদি রোগীকে জিজ্ঞেসই না করেন রোগী কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে, কেন এসেছে, তাহলে সে ব্রোকারকে সহায়তা করছে। তাই রোগী সম্পর্কে ন্যূনতম তথ্য জেনে চিকিৎসা দেওয়া এবং ব্রোকারচক্রের প্রভাব কমানোকে তিনি জরুরি বলে মনে করেন।

ওষুধ সরবরাহ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বাজেট বাস্তবায়ন

সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বাড়ানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান জানান, স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে এবং এ টাকা ফেরত দেওয়া যাবে না—কারণ বরাদ্দ ফেরত যাওয়াকে তিনি সরাসরি “অদক্ষতা” হিসেবে দেখেন।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো হাসপাতাল যদি ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় এবং বছরের শেষে ৪ কোটি টাকা ফেরত দেয়, তাহলে পরের বছর আর ১৫ কোটি পাবে না; বরাদ্দ কমে যাবে। আবার অর্থ অপচয় বা দুর্নীতির মাধ্যমে খরচ করাও সমানভাবে ক্ষতিকর। তাই একদিকে দক্ষতার সঙ্গে খরচ, অন্যদিকে দুর্নীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ—এই দুইটি বিষয়কে তিনি নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

তিনি বলেন, যেখানে যেখানে কর্মকর্তারা যাচ্ছেন, সেখানে সবাইকে বলা হচ্ছে— প্রপার প্রক্রিয়ায় যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিক্স চাইতে হবে, দর নির্ধারণ করে স্বচ্ছতার মাধ্যমে ক্রয় করতে হবে, এবং এগুলো বাস্তবে ব্যবহার করতে হবে, যেন রোগীরা সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা পায়। এই দুইটি বিষয়কে তিনি নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে যেখানে কর্মকর্তারা যাচ্ছেন, সেখানে সবাইকে বলা হচ্ছে— প্রপার প্রক্রিয়ায় যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিক্স চাইতে হবে, দর নির্ধারণ করে স্বচ্ছতার মাধ্যমে ক্রয় করতে হবে, এবং এগুলো বাস্তবে ব্যবহার করতে হবে, যেন রোগীরা সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা পায়।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল হেলথ কার্ড

গ্রামীণ জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, মানসম্মত ও সময়োপযোগী করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, পরিবার পরিকল্পনা, সাধারণ স্বাস্থ্য এবং সিএসসিপি—এই তিনটি ইউনিটের মাঠ পর্যায়ের সেবা একীভূত করা হচ্ছে। আগে যেখানে পরিবার পরিকল্পনার কর্মী শুধু পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত কাজ করতেন, এখন তিনি স্বাস্থ্য ও সিএসসিপি সংক্রান্ত সেবা একসঙ্গে দেবেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে তিনটি ভাগে সার্ভিস দেওয়া হবে, এবং এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ রেফারাল সিস্টেম দাঁড় করানো হবে—গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা/মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল হেলথ কার্ড সিস্টেম। তিনি বলেন, এই কার্ড পুরোপুরি ডিজিটাল হলে একটি ক্লিকেই বোঝা যাবে—কোন রোগী সরকারি সেবা নিয়েছে, কে প্রাইভেট সেক্টরে গেছে, কে মাঝপথে ড্রপ আউট হয়েছে। এতে জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসন সহজেই বুঝতে পারবে, কতজন সরকারি সার্ভিস নিচ্ছে, কতজন বেসরকারি সার্ভিস নিচ্ছে এবং কোথায় গ্যাপ রয়েছে। তার মতে, এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে।

হাসপাতালের ভিজিটর আওয়ার, সেবার বিঘ্ন ও জনসচেতনতা

হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিজিটর ও দলের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া, রাতের বেলায় বড় দল নিয়ে হাসপাতাল ভিজিট, রোগীদের ঘুম ও সেবার ব্যাঘাত—এসব বিষয়ে নবাগত তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ. এইচ. এম. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, একটি রোগীর সঙ্গে অত্যধিক সংখ্যক ভিজিটর থাকা রোগী ও অন্যদের জন্য সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ায় এবং ডাক্তার-নার্সের কাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

তিনি মনে করেন, নির্দিষ্ট ভিজিটর আওয়ার এবং ভিজিটরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি, এবং এর কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত হলে হাসপাতালের সেবা আরও শৃঙ্খলিত হবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সদর ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনসার মোতায়েন করা হয়েছে, এবং এদের সংখ্যা বাড়ানো গেলে ভিজিটর নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

ওষুধ ও পরীক্ষার সুবিধা নিয়ে রোগীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে হাসপাতালের ভেতরে যত বেশি সম্ভব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিক্স কেনার। তবে বাস্তবে কিছু পরীক্ষা বাইরে করতে হয়; তবু রোগীর সঙ্গে অতিরিক্ত আতেন্ডেন্ট থাকা অযৌক্তিক, এবং সেটি কমাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা দুটোই প্রয়োজন।

মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি এবং এন্টেনেটাল চেকআপ

মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমাতে কুষ্টিয়ার সরকারি উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় পর্যাপ্ত এন্টেনেটাল চেকআপের অভাব। গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত ডাক্তারের কাছে আসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন না হওয়ায় অনেক মা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যান—হোক সেটা সরকারি হাসপাতালে ডেলিভারি, অথবা ক্লিনিকে।

তিনি স্বীকার করেন, দেশে গর্ভবতী অনেক নারীই “আনওয়ান্টেড প্রাইভেসি”-এর মধ্যে থাকেন; তারা নিজেদের গর্ভধারণ সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলতে, হাসপাতালে যেতে বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান না। ফলে তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায় এবং ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো, পরিবার ও সমাজে গর্ভবতী নারীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এবং নিয়মিত এন্টেনেটাল চেকআপের সংস্কৃতি গড়ে তোলাকে তিনি অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপর্যাপ্ত দক্ষতা, “যাকে তাকে দিয়ে” সিজার বা সার্জারি করা—এসব বিষয়ে তিনি বলেন, এসব অপারেশন কখন, কোথায় হচ্ছে সেটা সময়মতো জানতে পারলেই প্রশাসন দ্রুত অভিযান চালাতে পারবে। তিনি গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

আর্থিক স্বচ্ছতা, অটোমেশন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের রাজস্ব আয় সম্পর্কে আলোচনায় প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি জানান, কঠোর মনিটরিং শুরু করার পর এক-দেড় মাসে মাসিক আয় ৮-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে; অটোমেশন পুরোপুরি চালু করতে পারলে মাসিক আয় ৩০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে—এটাই তাদের হিসাব।

তার মতে, রোগীরা সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, টাকা দিচ্ছে, কিন্তু পুরো অর্থ সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে না—এটা সরাসরি দুর্নীতি। অটোমেশন চালু হলে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অর্থ হাতবদল বা “ছিনতাই” বন্ধ হবে, এবং প্রকৃত আয় সরকারি হিসাবেই দৃশ্যমান হবে।

তিনি বলেন, অটোমেশন নিজেই একটি কঠিন কাজ—এখানে সবার সদিচ্ছা, সহযোগিতা এবং মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। কিন্তু একবার এটি সফলভাবে চালু হলে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মন্নানের অভিজ্ঞতা

সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মন্নান নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, জনবল ঘাটতি না থাকলে এবং লজিস্টিক সরবরাহ সঠিকভাবে হলে সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা অনেক উন্নত করা সম্ভব। তিনি রোগী ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার বিষয়টিকে আলাদা করে গুরুত্ব দেন। তার মতে, দালাল বা ব্রোকাররা রোগীকে ক্লিনিকে নিয়ে যেতে পারে তখনই, যখন রোগী তাদের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়। যদি রোগী ও তার পরিবার সরকারি হাসপাতালের প্রতি আস্থা রাখে, এবং দালালের প্রলোভনে বাইরে না যায়, তাহলে সরকারি হাসপাতালেই তারা ভালো ও নিরাপদ সেবা পেতে পারে। এজন্য তিনি জনসচেতনতা বাড়ানো, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, এবং সরকারি সেবাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করার ওপর জোর দেন।

আগামী পাঁচ বছরের স্বপ্ন: কুষ্টিয়াকে স্বাস্থ্য হাব হিসেবে গড়ে তোলা

কুষ্টিয়ার সন্তান হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে কুষ্টিয়ার স্বাস্থ্যখাতকে কোথায় দেখতে চান—এ প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, তার লক্ষ্য হলো রেফারাল স্ট্যাটিস্টিক্সের ভিত্তিতে “জিরো রেফারাল” নিশ্চিত করা—অর্থাৎ স্পেশালাইজড কিছু কেস ছাড়া কুষ্টিয়া থেকে অন্যত্র রোগী পাঠানোর প্রয়োজন থাকবে না।

তিনি বলেন, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, ইএনটি, নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিক্স—এই মৌলিক ও বিশেষজ্ঞ সেবাগুলোর জন্য রোগীদের যেন কুষ্টিয়া থেকে খুলনা, রাজশাহী বা ঢাকা যেতে না হয়, বরং কুষ্টিয়াতেই তারা সব সেবা পায়। তার ভাষায়, “আমাদের এখন দুইটা প্রতিষ্ঠান—ডিস্ট্রিক্ট হসপিটাল এবং মেডিকেল কলেজ হসপিটাল। আমার মনে হয় না যে খুলনা বিভাগের মধ্যে আমরা এটাকে একটা হাব বানাতে পারব না। ইনশাল্লাহ, এটাই আমাদের সবার পরিকল্পনা।”

কুষ্টিয়া ও বৃহত্তর এলাকার মানুষের জন্য একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ, মানসম্মত এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই তার ও সহকর্মীদের লক্ষ্য—এই আত্মবিশ্বাস তিনি সাক্ষাৎকারে বারবার প্রকাশ করেছেন।