মিজানুর রহমান নয়ন \ তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা বিনামূল্যে ও সাশ্রয়ী মূল্যে পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আশির দশকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করেন সরকার। তবে সেই সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের আওতাধীন কয়েক হাজার প্রান্তিক মানুষ। কারণ, সেখানে কর্মরত চিকিৎসক শারমিন আক্তার ও ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন সময়মতো কার্যালয়ে থাকেন না। আন্দোলনের বাজারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চিত্র। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা ১০টা – ১১টার আগে আসেন না। তবে ১২টা বাজলেই চলে যান। আবার ঠিকঠাকভাবে রোগী দেখেন না। জানালায় দাঁড়িয়ে থাকেন রোগীরা। চিকিৎসক মৌখিকভাবে শুনে মনগড়া ওষুধ দেন। তবে কোনো প্রেসক্রিপশন দেননা। আবার চাহিদামতো ওষুধও পাওয়া যায়না কেন্দ্রটিতে। ফলে একদিকে যেমন সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তৃণমূল পর্যায়ে অসহায়, দুস্থ ও খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, চিকিৎসক শারমিন দেরিতে আসলেও রোগী দেখেন। কাজ করেন। কিন্তু ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন সরকারি কোনো দাঁয়িত্বই পালন করেন না। সরকারি অফিস ফাঁকি দিয়ে তিনি পথেঘাটে ছেঁড়া কাগজ, প্লাস্টিকের বোতলসহ ময়লা আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়ান। সেগুলো আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কক্ষে মজুদ করে ব্যবসা করছেন। কার্যালয়ে দুই- তিনদিন অনুপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন নিয়মিত। তোলের মোটা অংকের বেতনও। ৩ দিনের আন্দোলনের বাজার-এর সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয়দের এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। আবার অভিযুক্ত নাসির আর চিকিৎসক শারমিন স্বীকারও করেছেন। তবে প্রায় ২০ বছর ধরে ফার্মাসিষ্ট নাসির এমন অনিয়ম করে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এতে চরম ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা ৫৬ মিনিট। তখনও দরজায় ঝুলছে তালা। উড়েনি জাতীয় পতাকাও। আসেননি চিকিৎসক ও ফার্মাসিষ্ট। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছেন রোগীরা। এরপর সকাল ১০টা ১মিনিটে কার্যালয়ের তালা খুললেন কেন্দ্রটির উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার। আর ১০টা ২৪ মিনিটে এসে জাতীয় পতাকা উড়ালেন ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন। এরপর হাসপাতালের কক্ষে রাখা ময়লা আবর্জনা থেকে কাগজ খুঁজে বস্তায় ভরা শুরু করেন নাসির। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সরেজমিন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে সরেজমিন এ চিত্র দেখা গেছে। অথচ সকাল আটটার মধ্যে এই কর্মকর্তাদের কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কথা। এ সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমার বাচ্চা অসুস্থ। আমিও শারীরিকভাবে অসুস্থ। সেজন্য আসতে দেরি হয়। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানে। ছুটির জন্য আবেদন করা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ফার্মাসিষ্ট নাসির নিয়মিত অফিসে আসেন না। আবার আসলেও অফিসে না থেকে পথেপথে কাগজ কুড়ো বেড়ান। ময়লা আবর্জনা এনে হাসপাতালের তিনটি কক্ষ ভরে রেখেছে। নিষেধ করলেও শোনেননা। এই বিষয়টিও স্যারেরা জানেন। আর অভিযোগ স্বীকার করে ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি এখানতে ৮টার পরে গিছি। ছেলের কাছে লঙ্গী আর গামছা আনতে। আসতি পথে কয়ডা কাগজ খুটিছিলাম। আর কয়ডা বোতল বেঁচতে লাগিছিলাম। সাইকেলে আসতে দেরি হইয়া গেছে। আজকে ভুল হইয়া গেছে। অফিস টাইমে এটা ( কাগজ কুড়ানো) করা ঠিকনা। আর এরকম হবিনানে। এবারকার মতো মাফ করে দেন।’ গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় সরেজমিন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে গিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে পাওয়া গেলেও ছিলেন না ফার্মাসিষ্ট। গত রোবারবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে দরজার তালা খোলেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। সেদিনও ছিলেন না ফার্মাসিষ্ট। কেন্দ্রটি নিয়ে সোমবার ‘ ডাক্তার আসেন ১১টায়, চলে যান ১২টায়’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন গেলে স্থানীয় বাসিন্দা শমসের আলী বলেন, ‘৯টায় এসে দেখি তালা মারা। কেউ নাই। পরে ১০টার দিক মহিলা ডাক্তার এসে তালা খুলল। পুরুষটার খোঁজই নাই।’ তাঁর ভাষ্য, প্রতিদিনই ১০টার দিক খোলা হয়। আবার একটা দুটো বাজলি বন্ধ হয়ে যায়। পুরুষ ডাক্তার সবসময় পথেপথে কাগজ খুটে বেড়ায়। এদিন সকাল ৯টার দিকে স্ত্রী আঙ্গুরী খাতুন ও শিশু সন্তান নিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসেন চাপড়া ইউনিয়নের ধর্মপাড়া গ্রামের দিনমজুর কুদ্দুস আলী। তিনি ৯টা ৫৫ মিনিটের দিকে বলেন, ‘‘কাল (সোমবার) বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা – জ্বর হয়ছে। হাসপাতালে ওষুধ নিতে এসে দেখি বন্ধ। ডাক্তারের জন্য দাঁড়িয়ে আছি।’ তাঁর স্ত্রী আঙ্গুরী খাতুনের ভাষ্য, সময়মতো ডাক্তাররা আসেনা। অনেকে অপেক্ষা করে করে ফিরে যান। সরকারি হাসপাতাল আর কত ভালো হয়। ষাটোর্ধ নারী নিকজান খাতুন বলেন, ‘ কয়দিন আগে পিছলে পড়ে যাইয়া ব্যাথা হয়ছে। তারপরে ঠান্ডা – জ্বর। সেদিনও ব্যাথার ক্যাপসুল দিলোনা। আজও কচ্ছে নাই। তাই ফিরে যাচ্ছি। গরীব মানুষ কিনতে পারলি কি এহেনে এতো ঘুরি? ’ স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে নাসির উদ্দিন চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ডিপ্লোমা ফার্মাসিষ্ট হিসেবে যোগদান করেন। নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিনি কার্যায়ের কক্ষেই বসবাস করে আসছেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি অফিস টাইমে ঠিকঠাক কার্যালয়ে থাকেনা। কার্যায়ের তালা খুলেই বেড়িয়ে পড়েন আশপাশের এলাকায় কাগজ ও ময়লা সংগ্রহের কাজে। সেগুলো আবার হাসপাতালের কক্ষেই মজুদ রাখেন এবং সুবিধামত সময়ে বিক্রি করেন। তিনি উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়নের চরসাদিপুর গ্রামের মৃত সেকেন্দার আলী মালিথার ছেলে। ভাঁড়রা বাজারের সাইকেল মেকার আমজাদ শেখ বলেন, ‘ঠিকঠাক অফিস করেনা নাসির। বেতন পায় ৬৫ হাজার। ও ( নাসির) বেশির ভাগ ডিউটি করে কাগজ কুড়াতে। আবার এসব কাগজ রাখে হাসপাতালে।’ বাজারের মুদি দোকানি মোবারক আলী বলেন, ‘ওর ( নাসির) কাগজ খুটা নাম। রাত – দিন সব সময় কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, গরুর হাঁড়মাড় খুঁটে বেড়ায়। সেগুলো আবার হাসপাতালের ঘর, বাজারের বিভিন্ন জায়গা রেখে পরিবেশটায় নষ্ট করে ফেলছে। জনগন অতিষ্ঠ। দ্রুত তাকে বদলি করা দরকার।’ চাপড়া গ্রামের মো. জিন্নাহ হোসেন বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে ছুটে এসে ময়লা আবর্জনা খোটে। আবার হাত না ধুঁয়ে দোড়ে গিয়ে মানুষের ওষুধ দেয়। এতে মানুষের রোগ আরও বাড়ছে। দ্রুত নাসিরকে অপসারণ করে ভালো ডাক্তার নিয়োগের দাবি তাঁর।’ শনিবার, রোববার ও সোমবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত না থাকলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত হাজিরা খাতায় উপস্থিতির সাক্ষর করা রয়েছে ফার্মাসিষ্ট নাসিরের। এ বিষয়ে কেন্দ্রটির উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘ফার্মাসিষ্ট অসুস্থ দাবি করে রাতে কেন্দ্রই থাকেন। হয়তো সেই সুযোগে স্বাক্ষর করেছেন। তবে শনি ও রবি তিনি উপস্থিত ছিলেন না। সোমবার এসেছিল ১২টার পরে। এ বিষয়ে নাসির বলেন, ‘সকাল হলেই মাথা ব্যাথা করে। সেজন্য বাড়িতে যায়না। আমার ভুল হয়েছে। আর হবিনানে।’ চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক মঞ্জু বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করলেও জনগন সেবা পাচ্ছেনা। এর একটা ব্যবস্থা হওয়া দরকার। ইউএনও কে বিষয়টি জানানো হবে।’ ফার্মাসিষ্ট নাসির একজন মানসিক রোগী বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামীমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আগের স্যারেরা কিভাবে কি করেছে তা জানিনা। বিষয়টি সিভিল সার্জনকে স্যারকে জানানো হয়েছে। স্যার সিদ্ধান্ত জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি তাকে কেউ জানায়নি। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত সাপক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হবে।
