মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটরের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার জের ধরে দেশজুড়ে যে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে, তা আমাদের জ্বালানি কাঠামোর করুণ অবস্থাই তুলে ধরেছে। মঙ্গলবার শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুনে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ৪ দিন পার হলেও এখনো মেরামত কাজ শেষ হয়নি। এর সরাসরি প্রভাবে দেশব্যাপী শিল্প উৎপাদন, গণপরিবহণ চলাচল এবং বাসাবাড়ির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। টার্মিনালের ত্রুটি সারাতে বিদেশ থেকে তিনজন প্রকৌশলী আনা হলেও এ সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত টার্মিনালটি চালু করা যায়নি। কবে চালু হবে তা অনিশ্চিত।
এ দুর্ঘটনার পর সারা দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে। এই ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতির কারণে আশুলিয়া, গাজীপুর ও ধনুয়াসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত শিল্পকারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একটি কারখানার উৎপাদন থমকে যাওয়া মানে শুধু অর্থনীতির ক্ষতি নয়, হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানে এবং জাতীয় রপ্তানিতে বড় ধাক্কা। পাশাপাশি তীব্র গ্যাস সংকট নাগরিক জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তুলেছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রশ্ন হলো, একটি মাত্র টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটিতে পুরো দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও জনজীবন কেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে শিল্প ও সিএনজি খাতে দেওয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বস্তুত এ সংকট আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আবারও প্রমাণিত হলো। যে কোনো দেশের সার্বিক অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি দ্রুততম সময়ে ত্রুটিমুক্ত করে চালু করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর সংকট সামাল দিতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতার পথ পরিহার করে দেশীয় স্থল ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং জ্বালানি খাতের টেকসই বিকল্প গড়ে তোলাই হতে পারে এ ধরনের জাতীয় বিপর্যয় এড়ানোর একমাত্র স্থায়ী পথ।