নিজ সংবাদ:
সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ আর দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বান্দরবানের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। কৃষিনির্ভর এসব পরিবারের বড় একটি অংশের আয়ের প্রধান উৎস জুম চাষ। প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই আয়ে সারা বছরের সংসার চালানো অনেক পরিবারের জন্যই কঠিন।
এমন বাস্তবতায় পাহাড়ি এলাকার অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সংগঠনটির উদ্যোগে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসব্যাপী বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। এতে প্রশিক্ষিত নারীদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আলীকদম ও বান্দরবান সদর উপজেলা হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উপকারভোগীদের মধ্যে রয়েছেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও। তাঁদেরই একজন আলীকদম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী চামমুম ম্রো। তাঁর বাবা জুম চাষ করে বড় পরিবারের ভরণপোষণ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকে সহযোগিতা করতে চান তিনি।
আলীকদমের লাইজু আক্তারের জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। প্রায় ১৩ বছর আগে তাঁর বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইসিসে পড়েন। বড় বোনদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন লাইজু। সেলাই মেশিন পাওয়ার পর টিউশনের পাশাপাশি সেলাই করে আয় করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
বান্দরবান সদরের মাসিংচিং মার্মা, মেসাইনু মার্মা ও শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যার স্বপ্নও একই—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করা এবং পরিবারকে সহযোগিতা করা।
আয়োজকরা বলছেন, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ নয়, এর আগে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়ায় নারীরা বাস্তব কাজের দক্ষতাও অর্জন করেছেন। ফলে মেশিনগুলো তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজ এবং জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু উদ্যোগটির প্রশংসা করে বলেন, এমন প্রশিক্ষণ ও উপকরণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
বসুন্ধরা শুভসংঘের জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের দক্ষ করে তুলতে পারলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
৪০ নারীর হাতে পৌঁছে দেওয়া সেলাই মেশিন তাই শুধু একটি উপহার নয়; দুর্গম পাহাড়ি জনপদে তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনাময় একটি হাতিয়ার।
