ঢাকা অফিস \ প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিদেশে বসে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নিয়ে বিদেশে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গিয়েছিল। তবে অনেক প্রচারণার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য চাহিদা থাকলেও নির্বাচনে তার প্রতিফলন সেভাবে ঘটেনি। সাড়ে সাত লাখের বেশি প্রবাসী ভোট দেওয়ার আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত সাড়া দেননি দুই লাখ ২২ হাজারের বেশি জন। এতে রাষ্ট্রের লোকসান হয়েছে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার বেশি। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হলে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য প্রবাস থেকে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন নিবন্ধন সম্পন্ন করেন। তাদের ভোট দিতে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রবাস থেকে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২ জন। প্রবাসীদের পাঠানো ভোটের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গ্রহণ করেছেন ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৪ জনের ব্যালট। রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে প্রবাস থেকে আসা ব্যালটের মধ্যে বৈধ হয়েছে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৭৩ ভোট। দুই লাখ ৯৫ হাজার ২৬০ জনের ব্যালট জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে কোনো কাজেই আসেনি। জানা গেছে, ১৪০টি দেশ থেকে প্রবাসীরা ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। তাদের কাছে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠিয়ে আবার ফেরত আনার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যয় হয়েছে ভোটারপ্রতি ৭০০ টাকা। দুই লাখ ৯৫ হাজার ২৬০ জনের ব্যালট কোনো কাজে আসেনি বিধায় ২০ কোটি ৬৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এদের মধ্যে ব্যালট পাঠালেও ভোট দেননি দুই লাখ ২২ হাজার ৮৬১ জন। এক্ষেত্রে পুরোপুরি অপচয় হয়েছে ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকেই ঠিকানা ভুল দেওয়ার কারণে ব্যালট হয়তো পৌঁছায়নি, অনেকেই সংশ্লিষ্ট দেশের ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠাননি। কেউ কেউ আবার ভোট দেননি। অনেকেই নিয়ম মেনে ভোট দেননি। মূলত এসব কারণেই প্রবাসীদের তিন লাখের মতো ভোট কোনো কাজে আসেনি। অন্যদিকে ব্যাপক প্রচারণায় তুমুল আলোচনা উঠলেও উদাসীনতাসহ নানা জটিলতায় ভোট দেননি অনেকে। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির কারণে নির্বাচন কমিশন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকদের সমন্বয়ে কারিগরি টিম করে এবং বিভিন্ন দল ও অংশীজনদের সুপারিশ নিয়ে হাইব্রিড পদ্ধতিটি (আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিং) গ্রহণ করে। এর জন্য ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় কমিশন। এরই মাঝে নির্বাচন কমিশন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি-বায়রাসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। তারা দেখে, বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী রয়েছে। ভোটের আগে সেই হিসাব তুলে ধরে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, “বিভিন্ন দেশে ঠিক কত সংখ্যক প্রবাসী রয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই। প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমরা কথা বলে জেনেছি ১ কোটি ৩০ লাখের মতো বা কিছু বেশি প্রবাসী রয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ বাংলাদেশির এনআইডি আছে। সেই হিসেবে ৫০ লাখের মতো ভোটারকে পাব বলে আশা করছি। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে প্রবাসী ভোটের হার ২০ থেকে ২২ শতাংশের মতো হয়।” তবে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের আগ্রহের ভাটার কথা বিবেচনা করে ১০ লাখ ভোটের লক্ষ্য নিয়ে এগোয় ইসি। যদিও সে লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। কর্মকর্তারা জানান, পোস্টাল ব্যালট প্রকল্পে তৈরি করা হয় ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামে অ্যাপ। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নাম-ঠিকানা ও মোবাইল, ই-মেইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে সে অনুযায়ী ব্যালট ছাপায় ইসি। এক্ষেত্রে অ্যাপ তৈরি, নিবন্ধনের জন্য ভোটারের কাছে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) পাঠানো, ব্যালট ছাপানো, ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠানো—সব মিলিয়ে প্রবাসীদের জন্য জনপ্রতি ব্যয় ধরা হয় ৭০০ টাকা। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরেও আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবী, ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের এই সুযোগ দেওয়া হয়। আর তাদের পেছনে ব্যয় হয় জনপ্রতি ৫০ টাকা। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জনের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। ভোট দিয়েছেন ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৬ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তারা পেয়েছেন ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৮ জনের ব্যালট। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছানো ব্যালটের মধ্যে বৈধ হয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৫২৪ ভোট। এতে দেড় লাখের মতো ভোটারের ব্যালট কোনো কাজে আসেনি। ফলে গচ্চা গেছে ৭৯ লাখ টাকার মতো। জানা গেছে, দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন করেছিলেন। মোট ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন। অর্থাৎ ভোট পড়েছে ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ। এদের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা মোট গ্রহণ করেছেন ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২ জনের ভোট। অর্থাৎ রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে পৌঁছেছে ৭৬ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট। আর রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে থাকা ভোটের মধ্যে বৈধ হয়েছে মোট ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭ ভোট। অর্থাৎ বৈধ ভোটের হার ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের জন্য আইন হয়ে গেছে। তাই এটা তো আর বাদ দেওয়া যাবে না। এছাড়া প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির ভিত্তিতেই আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থে সাড়া মেলেনি। তাই অনেক ব্যয়, সে তুলনায় সাড়া কম ইত্যাদি বিবেচনায় আমরা স্থানীয় নির্বাচনে এই ব্যবস্থা না রাখার কথা ভাবছি। এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম বলেন, প্রথমবারের মতো ইসি এই উদ্যোগটি নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। তবে অপচয়ের বিষয়টি ঘটেছে দু’টো কারণে। প্রথমত, কোনো পাইলটিং না করেই ইসি চেয়েছে সব প্রবাসীকে ভোটে আনতে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে ব্যাপক প্রচারের অভাব। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের মিসইউজ এড়াতে ব্যাপক প্রচার, ভোটার এডুকেশন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনেও আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেতে পারে। তবে নানা ভুল থাকলেও প্রথমবার হিসেবে অর্জিত পরিসংখ্যানকে তিনি সাধুবাদ দেওয়ার পক্ষে। আব্দুল আলীম বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তাদের প্রবাসীদের জন্য যতটা সফল হয়েছেন, বা তাদের যে হার, তার থেকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ভোটার টানার হার কম হবে না।
