বেসরকারি খাতকে ৩০ শতাংশ সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ

জ্বালানি তেলের বাজার

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

নিজ সংবাদ:

দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন করতে নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি খাতকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পেট্রোলিয়াম ব্যবসায় যুক্ত করার সুযোগ রেখে নতুন নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব বিপিসিকে দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নের পর তা বাস্তবায়নের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি, মজুত, বণ্টন ও বাজারজাতকরণের বড় অংশই বিপিসির নিয়ন্ত্রণে। দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করা হয়। বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল পরিশোধন বা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের উৎপাদিত জ্বালানি খুচরা বাজারে সরাসরি বিক্রির সুযোগ নেই। উৎপাদিত জ্বালানি বিপিসির কাছে বিক্রি করতে হয়।

বর্তমান ব্যবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারে। তবে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সীমিত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নিয়ন্ত্রিত পরিসরে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি ব্যবসায় যুক্ত করা হলে দেশের মজুত অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার, পরিবহনব্যবস্থা ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে জ্বালানি সরবরাহে সরকারি ব্যবস্থার ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণে একক নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিভিন্ন সময়ে তেল চুরি, অপচয় ও ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। বাজারে একাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতায় যুক্ত হলে এসব অনিয়ম কমানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে দেশের এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাত পূরণ করছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রিতভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে সরবরাহব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম ভারতের উদাহরণ দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশগ্রহণে জ্বালানি বাজার উদারীকরণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তবে তাঁর মতে, বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা দরকার। তাঁদের মতে, বিপিসির পরিবর্তে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আসতে পারে।

ইতোমধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপসহ অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও বেসরকারি বিনিয়োগকারী এ খাতে আসতে পারেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য স্থিতিশীলতা, আমদানিকৃত জ্বালানির মান, মজুত সক্ষমতা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির পাশাপাশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।