জ্বালানি নিরাপত্তায় ৫ বছরের রোডম্যাপ, বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

নিজ সংবাদ:

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। ২০৩১ সালের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত সক্ষমতা, আর্থিক চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু নতুন প্রকল্প বা অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সরকারের হিসাবে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে অনেক কেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে।

এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।

এ অবস্থায় নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো কম ব্যবহার হচ্ছে এবং কোন কেন্দ্র বন্ধ, পুনর্গঠন বা আধুনিকায়ন করা দরকার। পুরোনো অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যা সমাধান না করে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়তে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার জরুরি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু করা প্রয়োজন।

এলএনজিতে বাড়ছে নির্ভরতা

দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। এতে সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এলএনজি আমদানি আরও বাড়লে এই ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

ভোলার গ্যাস হতে পারে বিকল্প

এ ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি।

অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার চাপও কিছুটা কমতে পারে।

বিপিডিবির আর্থিক চাপ

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক দুর্বলতাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। উৎপাদন ও বিদ্যুৎ কেনার পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের বিল পরিশোধের দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটির ওপর।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতীর মতে, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় না নেওয়া। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা।

পারমাণবিক প্রকল্পেও প্রশ্ন

নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো উৎপাদনে আসেনি। এর উৎপাদন শুরুর সময় একাধিকবার পিছিয়েছে।

এ অবস্থায় নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে বিদ্যমান প্রকল্পের ব্যয়, উৎপাদন সক্ষমতা ও আর্থিক দায় বিবেচনা করা জরুরি।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের পরিকল্পনাগুলো ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর

সরকারের রোডম্যাপে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি কয়লা ও এলএনজিনির্ভর নতুন অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ করলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য নাও আসতে পারে।

উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদীর মতে, নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে জ্বালানি নিরাপত্তার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা টেকসই নয়। বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

আলাদা কর্মপরিকল্পনার কথা সরকারের

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি রূপরেখা। তাই এতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ফ্রেমওয়ার্কে মূলত কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে।

সরকারের পাঁচ বছরের এই রোডম্যাপে নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির বড় পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান অতিরিক্ত সক্ষমতা, এলএনজি আমদানির ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। ফলে ২০৩১ সালের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা শুধু নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর নয়; স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যমান সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সরকার কতটা সফল হয়, তার ওপরও নির্ভর করবে।