টঙ্গীর বস্তিতে নারী মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

নিজ সংবাদ:

রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা—সব মিলিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারবারে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশও সক্রিয় বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, টঙ্গীর কয়েকটি বস্তিতে নারী মাদক কারবারিদের ঘিরে গড়ে উঠেছে পৃথক নেটওয়ার্ক। তাঁদের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ মাদক সংগ্রহ, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে স্থানীয়ভাবে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করে পরবর্তী সময়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, জমি ও যানবাহনের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। গত বছরের ২ নভেম্বর ইয়াবা ও হেরোইনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।

একই বস্তির আরেক আলোচিত নারী মাদক কারবারি ময়না খাতুন। তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও মাদক কারবারে জড়িত। মেয়ে নার্গিস, পুত্রবধূ রোজী, ভাই শফিকুল ইসলাম এবং ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ ও মামলা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। মাদক ব্যবসার অর্থে গাজীপুর ও মাদারীপুরে সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে পরিবারের বিরুদ্ধে।

ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, একসময় তিনি ফেনসিডিলের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রি করেন। এ কাজে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কেরানীরটেক বস্তিতে কুলসুমের বিরুদ্ধেও মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও মাদক কারবারের মাধ্যমে তাঁর সম্পদ বেড়েছে। রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। একই এলাকার কারিমা বেগমের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও লক্ষ্মীপুরা এলাকাতেও নারী মাদক কারবারিদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কাশিমপুরের নয়াপাড়ার ডালিয়া বেগমের জীবনযাত্রায় কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়রা জানান। আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করলেও বর্তমানে তাঁর পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে। লক্ষ্মীপুরার তাহমিনা ও আশার বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চালানো হচ্ছে। গত আট মাসে এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি বস্তির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং রাজউকের সহায়তায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তিতে অভিযান চালানো হবে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান নয়, মাদকের সরবরাহ, অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা ও পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।