১১ দলের লংমার্চের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

ডিসেম্বরে সরকার পতনের ডাক

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন:

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে জনসভা দিয়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি শেষ হয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে সমাবেশে। পথে কাঁচপুর (নারায়ণগঞ্জ), পদুয়া বাজার (কুমিল্লা), মহিপাল (ফেনী) ও মিরসরাই (চট্টগ্রাম)-এ পথসভা হয়।

লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন, “ইনশাআল্লাহ… ডিসেম্বরের মধ্যে এ সরকারের পতন হবে… সরকার কিছু করুক বা না করুক, নিজের ভারে নিজেই পড়ে যাবে।” তাঁর এই বক্তব্যের পর “ডিসেম্বর” শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

এলডিপি চেয়ারম্যানের এই সময়সীমা-ঘোষণা কি সরকারকে চাপ দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল, নাকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত—তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জোটের শীর্ষ নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন এবং পর্যায়ক্রমে আরও বিভাগীয় লংমার্চের কর্মসূচি জানিয়েছেন।

ছয় দফা দাবি, এক লক্ষ্য:

১১ দলীয় জোটের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে:
• গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন
• জুলাই গণহত্যার বিচার
• বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন
• নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ
• আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধ
• প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি

এসব দাবির অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সরকারকে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং সেই দাবিকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তনের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়েই মূল বিতর্ক।

রাজপথ বনাম ভোটের বাক্স:

বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসমাগম কোনো দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠের শক্তির পরিচয় দিতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের জনমত নির্ধারণ করা যায় না। কারণ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত দেন।

রাজপথের আন্দোলন এবং নির্বাচনের ভোট—দুটিই গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু তাদের ভূমিকা এক নয়। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে কোনো দাবি মানতে চাপ দেওয়া যেতে পারে; অন্যদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্ধারণ করেন কে সরকার পরিচালনা করবেন।

এই দুইয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

জোটের নতুন সমীকরণ: জামায়াত ও এনসিপি-

১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে।

জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে হলে দলটিকে রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।

অন্যদিকে জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসা এনসিপি শুরু থেকেই প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছে। পরিবারতন্ত্র, দখলদারিত্ব ও প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও তাদের বক্তব্যে এসেছে।

এখন জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একই কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণের ফলে তাদের “নতুন রাজনীতি”র অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক জোট ও কৌশল পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও সেই পরিবর্তন তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

সামনের কর্মসূচি: রংপুর, খুলনা, সিলেট, ঢাকা:

লংমার্চের পর জোটের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেটে বিভাগীয় লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কিছু সূত্রে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশের ইঙ্গিতও এসেছে।

এই ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং জনমত গঠনের চেষ্টা চলছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গণতন্ত্রের মৌলিক প্রশ্ন:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। অতীতে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নানা বিতর্ক সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

তবে একটি দেশের সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের হাতেই থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা, আন্দোলন, নির্বাচন ও ক্ষমতার পরিবর্তন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া প্রয়োজন দেশের নাগরিকদের মতামত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

ডিসেম্বরকে ঘিরে অলি আহমদের দেওয়া সময়সীমা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার পরিবর্তনের পথটি কী হবে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বিরোধী দল আন্দোলন করবে, সরকারের সমালোচনা করবে এবং জনগণের সমর্থন চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে জনগণ নির্বাচনের সময় ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে বেছে নেবেন।

তাই রাজপথে বড় সমাবেশ যেমন রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ, তেমনি ভোটের বাক্সও জনমতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। রাজপথের আন্দোলন যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করে, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই “ডিসেম্বর” কেবল একটি সম্ভাব্য সময়সীমার নাম নয়; এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কে? জনগণ ও তাদের ভোট, নাকি রাজপথের রাজনৈতিক শক্তি? গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ প্রতিনিধি