প্রসঙ্গ : ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বহুমাত্রিক—ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলসহ নানা শাখায় বিস্তৃত। দুই দেশের মানুষের মধ্যেও রয়েছে শিকড়ের বন্ধন। তার পরও নানা সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সংকট দেখা দিয়েছে। আশার কথা হলো, অতীতে সেসব সংকট কাটিয়ে উঠে উভয় দেশ ঠিকই সম্পর্কের দৃঢ় পাটাতন রচনা করেছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে তা এখন বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাপি দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ‘খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে।’ বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত, এই ইতিবাচক আবহ কাজে লাগিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। সর্বশেষ বৈঠক সম্পর্কে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ঢাকার পক্ষ থেকে বেশ কিছু বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। একটি হলো—মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া ঢাকার পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘সহায়ক পরিবেশ’ (এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট) তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি এসব বিষয় সময়োপযোগী ও অত্যন্ত যৌক্তিক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত আশা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার এলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। ভারত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এরপর দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নানা পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা—এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্যকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার নিয়ে করা মন্তব্যগুলোকে তারা সমর্থন করে না। আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে মূলনীতিটি মনে রাখা জরুরি; জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকলে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের এই সুযোগগুলো কাজে লাগানো উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যথার্থই বলেছেন, ‘ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানা দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতকে পেছনে ফেলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ফ্রেশ স্টার্ট জরুরি।’ আমরাও মনে করি, দুই দেশের মধ্যে মত পার্থক্য থাকবে, নানা বিষয়ে সংকটও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সুরাহার একমাত্র পথ হতে পারে আলোচনা। পারস্পরিক সমঝোতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে যেকোনো বড় সংকট সমাধান করা যায়। তাই দুই দেশের মধ্যে আলোচনার যে সূত্রপাত হয়েছে, তা আরো নিয়মিত হোক। উভয় পক্ষের মনে রাখা জরুরি, সংলাপই সংকট সমাধানের মূল চাবিকাঠি।