নিজ সংবাদ:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর জমি দখলের অভিযোগের তদন্ত করে এর সত্যতা পেয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। প্রায় দুই বছর ধরে সরেজমিন তদন্ত শেষে ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি মেঘনা গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদীর প্রায় ২৪১ দশমিক ২৭ একর জমি দখলের তথ্য পেয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দখল করা জমির মধ্যে ৮৪ দশমিক ৭৭ একর এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা ও মূল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫ দশমিক ৫ একর জমিতে সড়ক নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে। নদীর তীর, মূল ভূমি ও প্লাবনভূমি ভরাট করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী জেলা প্রশাসন নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশে দখল করা নদীর জমি দ্রুত উদ্ধার করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআইডব্লিউটিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে কাজ শুরু করে। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে তদন্ত কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় তদন্ত শুরু করা হয়। কমিটির সদস্যরা সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যের বাজার, হোসেনপুর ও পিরোজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চর রমজান, সোনাউল্লাহ, পূর্ব দামোদরদী, পশ্চিম দামোদরদী, দুধঘাটা, টেঙ্গরচর, ছয়হিস্যা, নরসুলদী, আষাঢ়িয়ারচর ও ঝাউচর এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিন পরিদর্শনের সময় তদন্ত কমিটি মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস, সুগার রিফাইনারি, ফ্রেশ সুগার, কেমিক্যাল কারখানা, ফ্রেশ সিমেন্টসহ মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব স্থাপনার কয়েকটি নদীর মূল ভূমি, তীরবর্তী এলাকা ও প্লাবনভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনা নদীর শাখা মারাখালী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের তীর থেকে নদীর ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত দখলের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর, স্থাপনা ও জেটি নির্মাণের তথ্যও পেয়েছে কমিটি।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নদীর জমি ভরাট ও দখলের কারণে মেঘনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শুধু নদীর পানি প্রবাহই নয়, আশপাশের জলাভূমি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে ভূমি রেকর্ডের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভূমি অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ডে মেঘনা গ্রুপের দখলে থাকা অনেক জমি নদীর জমি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। আবার আরএস রেকর্ডে কিছু জমি খাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার পর তা অন্যের কাছে বিক্রি করার ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সরকারের নির্ধারিত অংশের অর্থ পরিশোধের বিধান রয়েছে। তদন্ত কমিটি কিছু জমির ক্ষেত্রে এই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
মেঘনা গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জেটি থাকার বিষয়ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব জেটির জন্য বিআইডব্লিউটিএর অনুমতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর বক্তব্য অনুযায়ী, নদীর জমিতে স্থাপিত দুটি জেটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।
এ ছাড়া মেঘনা গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির মতে, নদীর জমি বা প্লাবনভূমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সেখান থেকে তরল বর্জ্য নদীতে পড়লে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নদীর জমি উদ্ধার ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তদন্ত কমিটি মোট ১২টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে দ্রুত নদীর জমি চিহ্নিত করা, দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর মেঘনা নদী দখলের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন দখলে থাকা নদীর জমি পরে উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে শুধু দখল উচ্ছেদ নয়, ভবিষ্যতে যাতে নতুন করে নদী দখল না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন তাঁদের হাতে এখনো পৌঁছায়নি। তবে এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে সভা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মদিনা গ্রুপের দখলে থাকা নদী ও নদীতীরবর্তী সরকারি সম্পত্তি ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দখলের বিষয়ও তালিকাভুক্ত করে নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে মেঘনা নদীর দখলকৃত জমি উদ্ধারের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।
