কুমারখালীতে পথভ্রষ্টে নিখোঁজ ৩ শিশুকে দুইদিন পর উদ্ধার

বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২৬

 

কুমারখালী প্রতিনিধি \ শামীম, শাওন ও তালহা তিন বন্ধু ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তাদের খেলাধূলা, পড়াশোনা, বেড়ানো ও দুরন্তপনা একই সঙ্গে। পড়াশোনা তাঁদের খুব একটা ভালো লাগেনা। তাই অজানা ও কল্পনার জগতকে জানার তীব্র ইচ্ছে তাঁদের। সেজন্য কয়েকমাস ধরে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে অজানায় হারানোর পরিকল্পনা করেছে। অবশেষে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সকলের অগোচরে হঠাৎ একদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় তিন বন্ধু। এরপর তাঁদের হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। মর্মান্তিক ঘটনায় সাড়া পড়ে এলাকায়। ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরালও হয়। পরে ফেসবুকের কল্যাণে তাঁদের উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৫ মে) রাতে কুষ্টিয়ার খোকসা থেকে তাদের উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা হলেন – কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের বুজরুক দুর্গাপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে শামীম (১২)। সে কুমারখালীর এম এন পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। অপর দুজন হলেন একই এলাকার সোহাগের ছেলে শাওন (১৩) ও তরুণ খানের ছেলে তালহা (১২)। তারা দুর্গাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ?পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ মে দুপুরে পরিবারের অগোচরে তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি তারা। স্বজনরা সম্ভাব্য স্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ওইদিন রাতে কুমারখালী থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনজনের ছবি ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ?এরপর শুক্রবার রাতে ঢাকা- কুষ্টিয়া রেলপথের মধুমতি এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজবাড়ীর কালুখালী থেকে ক্রিকেট খেলে ফিরছিলেন খোকসার সাতপাখিয়া এলাকার কয়েকজন তরুণ। তারা তিনজনকে দেখে ফেসবুকে ছড়ানো ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে দ্রুত পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর তাদের খোকসা রেলস্টেশনে নামিয়ে কুমারখালী থানা পুলিশকে খবর দেন। পরে কুমারখালী থানা পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। শুক্রবার রাতে কুমারখালী থানা চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, উদ্ধারের পর তিন বন্ধুকে স্বজনদের কাছে হন্তান্তর করছে পুলিশ। তুলে রাখা হচ্ছে তাদের ছবি। এসময় ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি শামীমের বাবা আব্দুর রহিম। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, সেদিন (বৃহস্পতিবার) দুপুর পর্যন্ত একসঙ্গে দুজনে ধান কাটাকাটি করেছিলাম। পরে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সেই ফাঁকে শামীম ঘরের জানালা খুলে ব্যাগ, কিছু টাকা আর জামাকাপড় নিয়ে পালিয়ে গিছিল। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় জিডি করেছিলাম। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে ছেলেটাকে ফিরে পেয়েছি। তাঁর ভাষ্য, শামীম মাসখানেক ধরে হারিয়ে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়া ও মরে যাওয়ার কথা বলত। ঠিক হারিয়ে যাওয়ার পর ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম ৬ বন্ধু একসঙ্গে কাল্পনিক জগতে হারানোর পরিকল্পনা করেছিল। নাম প্রকাশ না করা শর্তে উদ্ধারকৃত এক শিক্ষার্থী বলে, পড়াশোনা খুব একটা ভালো লাগেনা তাঁদের। তাই অজানাকে জানার জন্য কাউকে না জানিয়ে বাড়ির ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হারিয়েছিল। পরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিলো তাঁদের। তবে এখন বুঝলাম। আমাদের ভাবনা ভুল।’ তাঁর ভাষ্য, কয়েকদিন ধরে তারা বিভিন্ন ট্রেনে বেড়িয়েছে। আর কাছে থাকা টাকায় খাওয়া দাওয়া করেছে। ?শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় শামীমের মা রূপা খাতুন ও কৃষক বাবা আব্দুর রহিম। এ সময় আহাজারি করতে করতে মা রূপা খাতুন বলেন, ‘ ও ( শামীম) কয়েকমাস ধরেই হারিয়ে যাওয়া, চলে যাওয়ার কথা বলত। একদিন বলল, আমি ভিন্নজগতে হারা যাবো, গার্মেন্টসে কাজ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আবার ফিরে আসব। কিন্তু সত্যিই এভাবে হরাবে বুঝতে পারিনি।’ কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, মূলত শখ পূরণ ও অজানাকে জানার এক কাল্পনিক মোহে পড়ে তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। গণমাধ্যম ও ফেসবুকের প্রচারণার সুবাদে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের দ্রুত উদ্ধার করে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্তানের প্রতি সকলকেই আরও সুদৃষ্টি প্রদানের আহবান জানান তিনি।