ট্রাম্পের বেইজিং সফরে করপোরেট জায়ান্টদের কূটনীতিক মিছিল; ব্যবসা ও রাজনীতির বড় বাজি

বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর যেন বাণিজ্য-রাজনীতির এক জটিল মঞ্চে রূপ নিয়েছে, যেখানে প্রধান চরিত্র হলেন কয়েকটি বড় আমেরিকান করপোরেট জায়ান্ট এবং তাদের সিইওরা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সাফল্য পাকা করা এবং চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা—এই দু’টো লক্ষ্য নিয়েই ট্রাম্প তাদের সঙ্গে রয়েছেন। গত কয়েক বছরে ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত শুল্ক ও তার জবাবে চীনের পাল্টা শুল্কের সৃষ্টি করা বাণিজ্য-সঙ্ঘাত মীমাংসার পথে এখন কোর উপকরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে এই ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল।

বেইজিংয়ে বুধবার (১৩ মে) পৌঁছানোর পর ট্রাম্পও শীর্ষ নির্বাহীদের চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং বলেন, তাঁরা মার্কিন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের “বিশিষ্ট প্রতিনিধি” যারা চীনকে গভীর সম্মান জানান। শি জিনপিংও তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতায় ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। প্রতিনিধি দলের সূচিতে রয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্স-এর ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের ডেভিড সলোমন; পাশাপাশি ব্ল্যাকরক, সিটি গ্রুপ, ব্ল্যাকস্টোন ও বোয়িং-এর শীর্ষস্থানীয় নেতারা রয়েছেন।

এই সফরের নেপথ্যে রয়েছে কট্টর অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রযুক্তি খাতের অনেক কোম্পানি ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল মৃত্তিকা ধাতু ও অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য চীনের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল; এই উপকরণগুলো স্মার্টফোন, ড্রোন বা যুদ্ধজাহাজের সেন্সর — সবক্ষেত্রেই কাজ করে। ইলন মাস্কের লক্ষ্য টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ ব্যবস্থার চীনে অনুমোদনপত্র জোগাড় করা এবং সৌর প্যানেল উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলারের সরঞ্জাম সংগ্রহ। এনভিডিয়ার হুয়াং চীনের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এআই বাজারে তাদের উন্নত ‘H200’ চিপ বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে চাইছেন। একইভাবে অ্যাপল ও বোয়িং নিজেদের উৎপাদন ও বিক্রয় চেইন স্থিতিশীল করতে নতুন চুক্তির প্রত্যাশী।

রাজনীতিকভাবে এই সফর ট্রাম্পের জন্য সময়োপযোগী। ইরান সংকট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ে চাপের মধ্যে ট্রাম্প সিলিকন ভ্যালির সমর্থন ও নির্বাচনী অংশগ্রহণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প এই সিইওদের মাধ্যমে জনমনে একটি বার্তা দিতে চান—তিনি চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করছেন। তবে বাণিজ্য-রাউন্ডে চীনের দাবিগুলোও কঠোর হতে পারে: শুল্ক প্রত্যাহার, প্রযুক্তি সংবিধান বা সেমিকন্ডাক্টর প্রবেশাধিকার—এসবই হবে আলোচ্যসূচির মূল বিষয়।

এই ‘ব্যবসায়িক কূটনীতি’ স্থিতিশীল চুক্তিতে রূপ নেয় কি না, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শুল্ক এবং প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার নিয়ে সমঝোতা হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে উদ্ভাবন ও উৎপাদন খাতে সিঁড়ি চড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে; কিন্তু যদি প্রতিটি পক্ষই কড়া অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে বাণিজ্যবাণিজ্যিক উত্তেজনা নতুন করে জ্বলে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। এখন দেখা বাকী—এই সফর বিশ্ববাণিজ্যের নতুন মোড় স্থির করে কি না, নাকি কেবল রাজনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থের একটি অভিস্রুত মিলনস্থল হিসেবেই থেকে যাবে।