বিচার প্রক্রিয়ার ডিজিটাইজেশন জরুরি

রবিবার, আগ ২, ২০২৬

 

 

আদালত প্রাঙ্গণ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার ও শেষ ভরসার স্থল। সেখানে বিচারকের সিল, স্বাক্ষর এবং আদালতের গোপনীয় নথি যদি অসাধু চক্রের ‘হাটের পণ্যে’ পরিণত হয়, তাহলে তা সমগ্র বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়। মঙ্গলবার গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে ঢাকার আদালতপাড়ায় গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতচক্রের চিত্র। টাকা ফেললেই সেখানে মিলছে বিচারকের ভুয়া স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা, ভুয়া সমন, নোটারি হলফনামা কিংবা কাবিননামা। এমনকি অর্থের বিনিময়ে আসামি বদল বা ভাড়ায় আসামি সাজার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডও উঠে এসেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। বলা বাহুল্য, এসব কর্মকাণ্ড কোনো সাধারণ জালিয়াতি নয়; গুরুতর অপরাধ।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত অনুসন্ধানী নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে, আদালত প্রাঙ্গণের কিছু ফটোকপির দোকান, দালাল, অসাধু আইনজীবী এবং অসাধু কর্মচারীদের সমন্বয়ে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, একজন নিরীহ নাগরিক যখন বিচারকের জাল স্বাক্ষরযুক্ত ভুয়া সমন পেয়ে আতঙ্কিত হন, কিংবা কোনো অপরাধী যখন অর্থের জোরে মিথ্যা নথি তৈরি করে মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ পায়, তখন ন্যায়বিচারের মূল্যবোধটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা মনে করি, এ ধরনের গর্হিত কর্মকাণ্ড দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

স্বভাবতই এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের বা গ্রেফতার করা সাময়িক পদক্ষেপ হতে পারে, তবে আমরা মনে করি, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কেবল হস্তক্ষেপই চিরস্থায়ী সমাধান নয়। বরং বিচার প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং প্রতিটি ধাপে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা আনয়নই এই কারসাজি বন্ধের চাবিকাঠি। পরিস্থিতির টেকসই সমাধানের জন্য তাই ডিজিটাইজেশনের বিকল্প নেই। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে আদালতের প্রতিটি আদেশ, সমন, পরোয়ানা এবং সার্টিফায়েড কপিতে দ্রুত কিউআর কোড ও অনলাইন যাচাইকরণ ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সাধারণ মানুষ যে কোনো স্থান থেকে নথির সত্যতা এক ক্লিকেই নিশ্চিত করতে পারবে। একই সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থিত ফটোকপির দোকান ও সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার প্রিন্টিং পয়েন্টগুলোকে বিশেষ প্রশাসনিক তদারকির আওতায় আনতে হবে। কারণ, ভেতরের অসাধু সিন্ডিকেটের যোগসাজশ ছাড়া নথির গোপন তথ্য বা স্মারক নম্বর বাইরে আসা অসম্ভব, তাই অভ্যন্তরীণ কর্মচারীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামোর মূল ভিত্তি। সিল ও স্বাক্ষর জাল করে বিচার প্রক্রিয়াকে যারা জিম্মি করছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের রেহাই দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আধুনিক প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার এবং প্রশাসনিক শূন্য সহনশীলতার মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এখনই সময়। সাধারণ মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।