\ মনজুর এহসান চৌধুরী \
কুষ্টিয়া শহরের শ্রীশ্রী গোপীনাথ জিউর মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে রথযাত্রা ও রথমেলা আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত হয়, তা প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের ধর্মীয় অনুভূতি, লোকসংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নলডাঙার মহারাজা প্রমথ ভূষণ দেবরায়ের উদ্যোগে বিংশ শতকের শুরুতে, আনুমানিক ১৯০৫ সাল থেকে আষাঢ় শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথ প্রথম বের হয় গোপীনাথ জিউর মন্দির থেকে, এবং সাত দিন পর উল্টো রথে আবার মন্দিরে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে উৎসবের পর্ব সম্পন্ন হয়। সেই থেকে আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোড, রথখোলা, বড়বাজারসহ আশপাশের এলাকায় রথমেলা বসে, যা এখন প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিক ঐতিহ্যে পরিণত।

এই রথযাত্রার ইতিহাসে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯১৩ সাল, যখন স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী মাখন রায় সম্পূর্ণ পিতলের তৈরি, অপূর্ব কারুকাজে সজ্জিত এক বিশাল রথ নির্মাণ করে গোপীনাথ জিউর মন্দিরে দান করেন। ওই বছরের আষাঢ় শুক্ল দ্বিতীয়ায়ই প্রথমবার এই পিতলের রথ কুষ্টিয়াবাসীর সামনে অভিষেক ঘটে বলে ধরে নেওয়া হয়, কারণ সেদিনই মূল রথযাত্রার দিন। পাকিস্তান আমল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই ঝকঝকে সোনালি আভাযুক্ত পিতলের রথ শহরের মানুষের চোখে রথযাত্রার পরিচয় হয়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর অস্থির সময়ে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কুষ্টিয়া অঞ্চলে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের ফলে এই পিতলের রথ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়—অনেকের বক্তব্য, রথের পিতল খুলে নিয়ে যাওয়াই ছিল মূল কারণ।
পিতলের ঐতিহাসিক রথ হারিয়ে যাওয়ার পরেও কুষ্টিয়ার মানুষের ভক্তি ও উৎসবপ্রেম থেমে থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দশকে, আনুমানিক ১৯৮০ু১৯৮৫ সালের মধ্যে মন্দির কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ভক্তদের উদ্যোগে নতুন একটি রথ তৈরি করা হয়, যেখানে লোহার ফ্রেম ও জিআই শীট ব্যবহার করে শক্ত ও টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এই জিআই রথই এখন গোপীনাথ জিউর মন্দিরের রথযাত্রার মূল বাহন; প্রতি বছর বাংলা ৩১ আষাঢ়, যেমন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে ৩১ আষাঢ় পড়েছে ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই, সেদিন সকালে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ এই রথে বসিয়ে মন্দির থেকে সোজা রথ বের হয় শহরের দিকে। প্রায় সাত দিন বড়বাজার সংলগ্ন নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান শেষে উল্টো রথে আবার মন্দিরে ফিরে আসেন দেবতারা, আর এই দুই পর্বকে ঘিরে শহরে যে রথমেলা বসে, তা কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বড় কেন্দ্র।
কালের পরিবর্তনের সঙ্গে কুষ্টিয়ার রথযাত্রার চেহারায় আরও একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে ইসকন মন্দিরের মাধ্যমে। কুষ্টিয়া শহরের সাহাবিতি রোডে প্রতিষ্ঠিত ইসকন কেন্দ্র থেকে বিগত কয়েক বছর ধরে আলাদা একটি রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা একই শহরে দ্বিতীয় জগন্নাথ রথ হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই রথযাত্রাও সাধারণত আষাঢ় শুক্ল দ্বিতীয়া তিথির আশেপাশে শুরু হয়, পুরীর মূল রথযাত্রার তারিখের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে; ইসকনের রথে থাকেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি, আর শোভাযাত্রায় হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র, কীর্তন, মৃদঙ্গ ও করতালের ধ্বনিতে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ভক্তি-উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। সাহাবিতি রোডের ইসকন মন্দির থেকে এই রথ বের হয়ে নির্দিষ্ট রুট ধরে শহর প্রদক্ষিণ করে, কোনো এক নির্ধারিত স্থানে কয়েক দিনের জন্য “মাসির বাড়ি”-ধরনের অস্থায়ী কেন্দ্রে অবস্থান নেয়, পরে উল্টো রথযাত্রায় আবার মন্দিরে ফিরে আসে।
ফলে এখন কুষ্টিয়া শহরে একই সময়ে দু’টি রথযাত্রার উপস্থিতি দেখা যায়—একটি শতাধিক বছরের লোকঐতিহ্যভিত্তিক গোপীনাথ জিউর মন্দিরের রথ, আরেকটি আধুনিক ভক্তিমূলক সংগঠন ইসকনের আয়োজিত শহুরে রথযাত্রা। প্রথমটিতে রয়েছে পিতলের পুরনো রথের স্মৃতি, যুদ্ধ, লুটপাট, নতুন জিআই রথের জন্ম আর এনএস রোডের বিস্তৃত রথমেলা; দ্বিতীয়টিতে আছে আন্তর্জাতিক হরে কৃষ্ণ আন্দোলনের প্রভাব, সংগঠিত কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ ও শহরের নাগরিক জীবনে নতুন করে ভক্তিমূলক উৎসবের সংযোজন। ধর্মীয় আচার, লোকসংস্কৃতি, গ্লোবাল ভক্তিমূলক মুভমেন্ট আর শহুরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড—এই সবকিছুর মিলিত স্রোত এখন কুষ্টিয়ার রথযাত্রাকে এক বহুমাত্রিক জীবন্ত ঐতিহ্যে পরিণত করেছে, যেখানে দিন-তারিখ-সাল ধরে ইতিহাস যেমন লেখা যায়, তেমনি প্রজন্মের স্মৃতিও প্রতি বছর নতুন করে তৈরি হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
১৫.০৭.২০২৬
