\ মনজুর এহসান চৌধুরী \
বাংলাদেশে আজ সবচেয়ে লাভজনক অবৈধ ব্যবসার নাম মাদক। সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাদকের কারবার ও ব্যবহার এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার ৫ শতাংশকে মাদকাসক্ত বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মাদকের ছোবল পৌঁছেনি। সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—মাদক সেবনকারীদের অধিকাংশই কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম; গ্রাম-গঞ্জে দারিদ্র্য বা বেকারত্বের চেয়েও বড় সংকট এখন মাদক।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়া রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নতুন এই আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সাইবার স্পেস, অনলাইন নেটওয়ার্ক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক বেচাকেনা, সরবরাহ ও আর্থিক লেনদেনে যুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো পরিষ্কার বার্তা দিল যে মাদক ব্যবসা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবার, নৈতিকতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক নীরব যুদ্ধ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর তৈরি করেছে। ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত, সমুদ্রপথ ও আকাশপথ ব্যবহার করে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা থেকে শুরু করে আইস ও নানা ধরনের সিনথেটিক মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে চার অঞ্চলে ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত হওয়া প্রমাণ করে, সীমান্ত নিরাপত্তার দুর্বলতা এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, স্থানীয় মাস্তান ও প্রশাসনিক দুর্নীতির জাল মাদক ব্যবসাকে উচ্চ মুনাফার শিল্পে পরিণত করেছে, যেখানে বড় অর্থদাতা ও নেটওয়ার্কের কারিগররা অধিকাংশ সময় আইনের বাইরে থেকে যায়, আর ধরা পড়ে শুধু মাঠপর্যায়ের বাহক।
তাই নতুন মৃত্যুদন্ড আইনকে কেবল কড়া সাজা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি হওয়া উচিত প্রশাসন ও রাজনীতিকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি নৈতিক অঙ্গীকার। আইন পাস করলেই কাজ শেষ নয়—প্রয়োজন দ্রুত বিচার আইন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, সীমান্তে আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি, বার্মা বর্ডারে কম্বিং অপারেশন, মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের জাতীয় পর্যায়ে তালিকা প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজের আশপাশ মাদকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থপাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই কঠোরতার পক্ষে ও বিপক্ষে দু’বিচিত্র চিত্র তুলে ধরে। সিঙ্গাপুরে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি হেরোইন, কোকেন বা গাঁজা পাচারে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে; মাদক সংক্রান্ত অপরাধে ফাঁসি কার্যকরের জন্য দেশটি কুখ্যাত, অথচ সেখানে অ্যালকোহল স্বাভাবিক সামাজিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার অংশ—বার কালচার ও লাইসেন্সভিত্তিক লিকার বিক্রি পুরোপুরি আলাদা আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মালয়েশিয়ায়ও বিপজ্জনক মাদক আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ড্রাগ রাখলে বা পাচার করলে মৃত্যুদন্ড ও বেত্রাঘাতের বিধান আছে, কিন্তু অ্যালকোহল সেখানে বৈধ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারের মাধ্যমে চলে; ড্রাগ ট্রাফিকিং আর অ্যালকোহলকে আইনগতভাবে তারা দুই ভিন্ন জগৎ হিসেবে দেখে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অ্যালকোহলও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় থাকলেও মৃত্যুদন্ডের ফোকাস স্পষ্টভাবে “অ্যালকোহল ব্যতীত অন্যান্য মাদক”-এর ওপর, বিশেষ করে ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন ও আইসের মতো ড্রাগ নেটওয়ার্কের ওপর। সেই অর্থে বাংলাদেশও সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পথেই যাচ্ছে—মাদক পাচার ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অতি কঠোর আইন, আর অ্যালকোহলের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। প্রশ্ন এখন একটাই: এ কঠোর আইন শুধু কাগজে-কলমে থাকবে, নাকি সত্যিই বড় সিন্ডিকেট, সীমান্ত নেটওয়ার্ক এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবাই মিলে সম্মিলিত চাপ তৈরি করতে পারবে যদি পারে, তবে এই মৃত্যুদন্ড আইন একদিন সত্যিই মাদকমুক্ত বাংলাদেশের লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
১৪.০৭.২০২৬
