মিজানুর রহমান নয়ন ॥ নেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টি হলেই জমে থাকে পানি। আর ভারী বৃষ্টিতে শোবার ঘর, রান্নাঘর, ওয়াশরুম, বাথরুম সবখানেই উঠে যায় পানি। এসব পানি কোথাও ৬ মাস, আবার কোথাও থাকে ৯ মাস। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন কুষ্টিয়ার প্রথম শ্রেণির কুমারখালী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ড দুর্গাপুর গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার। বাসিন্দাদের ভাষ্য, সময়মতো পৌরকর পরিশোধ করা হয়। তবে গেল ২০ বছরেরও পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করেননি পৌর কর্তৃপক্ষ। বছরের অন্তত ৬ থেকে ৯ মাস হাঁটুসমান পানি জমে থাকে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপন। পানিবাহিত রোগে ভুগছেন অনেকেই। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবি জানান তাঁরা। রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে চলে গেছে নির্মাণাধীন পাকা ড্রেন। ড্রেনে পানি জমে থাকলেও প্রবাহ নেই। নির্মাণাধীন ড্রেন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দুরে অবস্থিত দুর্গাপুর গ্রামের একাংশ। সেখানে পাকা ও আধাপাকা অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি রয়েছে। বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য রয়েছে একটি আরসিসি ঢালাইয়ের পাকা সড়ক। তবে সেই সড়কটি ডুবে গেছে পানিতে। এছাড়াও সেখানকার শোবার ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, ওয়াশরুম, গোয়ালঘর সবখানেই থৈথৈ পানি। হাঁটু সমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করছে নানাবয়সি মানুষ। কেউ ঘরের পানি সেচে বাইরে ফেলছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রান্নার চুলা জ্বলেনি কারও। এ সময় ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী শিরিনা খাতুন বলেন, ‘ঘরে পানি, বাথরুমে পানি, টিউবওয়েলে পানি। সকাল থেকে রান্না – খাওয়া সব বন্ধ রয়েছে। পোলাপান স্কুলে যেতে পারতেছেনা। পুরুষ মানুষ কাজে যেতে পারছেনা। ১৫- ২০ বছর ধরে এভাবে পানির সাথে বসবাস। গৃহিণী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘ছাগল – ভেড়ী না খেয়ে রয়ছে। আমরা সকাল পর্যন্ত রান্না করতে পারিনি। খাতি পারিনি। টিউবওয়েল ডুবে গেছে। বাথরুম ডুবে গেছে। কয়ডা যে খাবো, আবার সে ভয়ও পাই, যে বাথরুমে যাব ক্যামনে সবকিছুর অসুবিধা। পরীক্ষা চলতেছে, ছোয়ালপাল স্কুলে যাতি পারতেছেনা।’ বয়োজ্যেষ্ঠ মো. শাজাহান আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘পানিতি ডুবে রয়ছি। সবঘরে পানি। ইউএনও সাহেবের একেবারে সামনেই এটা। সেতো কোনোদিনও খোঁজ নেয়না। তাঁদের কাছে তো কোনো সাহায্য চাচ্ছিনে। আমরা চাচ্ছি একটু সুস্থ থাকতি।’ তাঁর ভাষ্য, নিয়মিত কর পরিশোধ করা হলেও পানির কোনো ব্যবস্থা করেনা পৌরসভা। তাঁর স্ত্রী নুরজাহান খাতুন বলেন, বছরে ৬ মাস পানি জমে থাকে। সকাল থেকে একনাগারে বৃষ্টিতে রান্নাঘর – গোয়াল টোয়াল সব ভাসে গেছে। রান্নায় করতে পারিনি। কেউতো আসে দেখেও না ফুকচি দে। জলদি পানি বের করার ব্যবস্থা করেন। পানির কারণে দুর্ভোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন। তিনি কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বহুকাল পর ড্রেন করেছে। কিন্তু পানি যায়না। হাঁটুসমান পানি বেঁধে রয়েছে। পানিতে পয়জন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঘাঁ- পচরা রোগ হচ্ছে। সত্যি বলতে খুব কষ্টে আছি আমরা।’ বৃদ্ধ সুফিয়া খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘শ্বশুরের আমল থেকে বাস করতিছি। ভোটের সময় আসলি নেতারা কয়, এই দিবো, সেই দিবো। কই, কিছুতো দিলোনা। এবার ভোটই দিবোনা।’ তাঁর প্রশ্ন – ছেলেরা নাই হয় এদিক- সেদিক বসলো। কিন্তু মেয়েরা কোথায় বাথরুম করবি দ্রুত পানি নিষ্কাশন করার দাবি জানান তিনি। জানা গেছে, গড়াই নদীর কূলঘেঁষে ১৮৬৯ গঠিত কুমারখালী পৌরসভায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু এখানে ছিলোনা পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক। তবে ২০২৩- ২৪ অর্থবছর থেকে ধাপেধাপে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ড্রেন ও পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু একবছর মেয়াদী এই নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি দুইবছরেও। আবার নিম্নচাপের কারণে গত শনিবার বিকেল ৩টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে কুমারখালী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের কর্মকর্তা মো. মামুুনুর রশিদ। ফলে পৌরসভার ১, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সড়ক, উপজেলা পরিষদের প্রবেশপথ, উপজেলা সহকারী কমিশনার ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনের সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি মাড়িয়ে চলাচল করছে মানুষ। এছাড়াও উপজেলা পরিষদ মাঠেও জমে আছে হাঁটুসমান পানি। কেন্দ্রীয় যুব অধিকার পরিষদের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও পৌর বাসিন্দা শাকিল আহমেদ তিয়াস বলেন, ড্রেন নির্মাণ কাজে চরম ধীরগতি। ফলে এবারও ১, ৫ ও ৬ নম্বর কয়েক’শ বাড়িতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি। কুমারখালী পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, জনবল সংকট, স্থান সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানাবিদ কারণে ড্রেন নির্মাণকাজে কিছুটা ধীরগতি হয়েছে। আগামী দুই- তিন মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার প্রত্যাশা তাঁর। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে পৌর কর্তৃপক্ষ। দ্রুতই পানি সরে যাবে।
