নিজ সংবাদ \ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম, সাম্যবাদী চেতনা, অসাম্প্রদায়িক দর্শন এবং মানবমুক্তির আহ্বান নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’। এ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ১০ টার সময় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশব্যাপী একযোগে আয়োজিত এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসক মোঃ তৌহিদ বিন-হাসানের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল পৌনে ১০টার মধ্যেই আমন্ত্রিত অতিথি, সরকারি কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উপস্থিত হয়ে আসন গ্রহণ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় নজরুল সংগীত, নৃত্য, গীতিআলেখ্য ও কবিতা আবৃত্তির মধ্যদিয়ে জাতীয় কবির সাহিত্য, সাম্যবাদী দর্শন এবং দেশপ্রেমের বার্তা তুলে ধরা হয়। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। উপস্থিত দর্শক ও অতিথিরা শিল্পীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং জাতীয় কবির আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ, সাম্যের বাণী এবং তারুণ্যের প্রতি তাঁর আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর রচনা শুধু সাহিত্য নয়, সমাজ পরিবর্তনেরও অনুপ্রেরণা। বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের উদ্যোগকে সফল করতে সবার আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “কুষ্টিয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। মহাত্মা লালন সাঁই ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য এই জেলায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনা ও সাহিত্যচর্চারও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে আরও বিকশিত করতে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন বছরজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”
অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক (ডিডিএলজি) আহমেদ মাহবুবউল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) প্রণব কুমার সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আবদুল ওয়াদুদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মিজানুর রহমান, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম টুকুসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সুধীসমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, নজরুল ছিলেন সাম্য, মানবতা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীন চেতনার কবি। তাঁর আদর্শ আমাদের গণতন্ত্র, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আমাদের দেশনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিশ্বাস করি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি একটি মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সোহরাব উদ্দিন আরো বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবসময় সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সৃজনশীল চর্চার বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। আয়োজকরা জানান, ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’ উপলক্ষে কুষ্টিয়ায় বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে নজরুল সংগীত উৎসব, কবিতা আবৃত্তি, প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা সভা, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রচনা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং জাতীয় কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য, সাম্য, মানবতা, দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত অতিথিরা আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় কবির আদর্শ ও সৃষ্টিকে ঘিরে বছরব্যাপী এসব আয়োজন কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে গতিশীল করবে না, বরং তরুণ সমাজের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
