স্বাস্থ্যমন্ত্রীর খবরে ময়লার স্তুপ অপসারণ, তবে চরিত্র পাল্টায়নি ফার্মাসিষ্ট

ফলোআপ : চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

 

 

মিজানুর রহমান নয়ন \ ঘড়ির কাঁটায় ৯টা ৪৯ মিনিট। তখনও উড়েনি জাতীয় পতাকা। সুনসান নীরবতা। চিকিৎসক অলস বসে আছেন কার্যালয়ে। ছিলেন না ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন। যদিও হাজির খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সরেজমিন এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এ সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রেটির উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘সকালে এসে দেখি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর রয়েছে। তবু ফার্মাসিষ্ট নাসির কার্যালয়ে নেই। কোথায় গেছেন তা জানিনা।’ তাঁর ভাষ্য, প্রায়ই স্বাক্ষর করে নাসির কার্যালয়ে থাকেনা। এ সপ্তাহে শনি ও রবিবার উপস্থিত না থেকেও হাজিরায় স্বাক্ষর করেছে নাসির। এরপর দেখা গেল, সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে বাইসাইকেল চালিয়ে কার্যালয়ে আসলেন ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন। এসে ১০টা ২৩ মিনিটে উড়ালেন জাতীয় পতাকা। অথচ সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা। এ সময় ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অফিস খুলে নেহেদ ব্রিজে (কার্যালয় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে) চা টা খালাম। গোসল করতে নামিছিলাম। এরপর কয়ডা বোতল খুঁটিছি। কাগজ মাগজ খুঁটিছি। কিন্তু সাইকেলের জন্য দেরি হয়ে গেল। আমার ভুল হয়ে গেছে। এবার কার মতো ক্ষমা চাচ্ছি।’ তাঁর ভাষ্য, ছুটি ছাড়ায় শনি ও রবিবার কার্যালয়ে ছিলেন না। তবে হাজিরা খাতায় প্রতিদিনই স্বাক্ষর করেছেন তিনি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা ১০টা – ১১টার আগে আসেন না। তবে ১২টা বাজলেই চলে যান। আবার ঠিকঠাকভাবে রোগী দেখেন না। জানালায় দাঁড়িয়ে থাকেন রোগীরা। চিকিৎসক মৌখিকভাবে শুনে মনগড়া ওষুধ দেন। তবে কোনো প্রেসক্রিপশন দেননা। আবার চাহিদামতো ওষুধও পাওয়া যায়না কেন্দ্রটিতে। ফলে একদিকে যেমন সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তৃণমূল পর্যায়ে অসহায়, দুস্থ ও খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, চিকিৎসক শারমিন দেরিতে আসলেও রোগী দেখেন। কিন্তু ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন সরকারি কোনো দাঁয়িত্বই পালন করেন না। সরকারি অফিস ফাঁকি দিয়ে তিনি পথেঘাটে ছেঁড়া কাগজ, প্লাস্টিকের বোতলসহ ময়লা আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়ান। সেগুলো আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কক্ষে মজুদ করে ব্যবসা করছেন। কার্যালয়ে দুই- তিনদিন অনুপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন নিয়মিত। তোলের মোটা অংকের বেতনও। এনিয়ে আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে মঙ্গলবার চিকিৎসক শারমিন আক্তার ও ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিনকে কারণ দর্শনোর নোটিশ করেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তাঁরা ৩ কর্ম দিবসের মাধ্যে নোটিশের জবাব দিবেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামীমা আক্তার। সরেজমিন দেখা যায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির আঙিনার আগাছা গুলো কেটে ফেলা হয়েছে। তিনটি কক্ষে ফার্মাসিষ্ট নাসিরের রাখা ময়লার স্তুপ নেই। অনেকটায় পরিস্কার পরিছন্ন। এসময় কেন্দ্রটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার খবরে পরিস্কার পরিছন্ন করা হয়েছে। দুজনকেই শোকজ করেছেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। নির্দিষ্ট সময়েই জবাব দেওয়া হবে।’ শোকজের বিষয়টি স্বীকার করে ফার্মাসিষ্ট নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ শুনেছি শোকজ করেছে। আজ (বৃহস্পতিবার) একটার দিকে উপজেলায় যাবো। ভাবছি অসুস্থতার কথা বলে সিএল ছুটি নিবো।’ তিনি আরও বলেন, কক্ষের কাগজপত্রাদি গুলো ট্রাক ভরে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা শমসের আলী বলেন, ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নষ্ট হয়ে গেছে। মহিলা ডাক্তার ৯টা, ১০টায় আসলেও পুরুষ থাকেনা। তিনি ( নাসির) পথেপথে কাগজ কুড়ো বেড়ান। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রবেশ পথে আমজাদ শেখের সাইকেল মেরামতের দোকান। তিনি বলেন, ‘ ঠিকঠাক অফিস করেনা নাসির। বেতন পায় ৬৫ হাজার। ও ( নাসির) বেশির ভাগ ডিউটি করে কাগজ কুড়াতে। আবার এসব কাগজ রাখে হাসপাতালে।’ বাজারের মুদি দোকানি মোবারক আলী বলেন, ‘ওর ( নাসির) কাগজ খুটা নাম। রাত- দিন সব সময় কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, গরুর হাঁড়মাড় খুঁটে বেড়ায়। সেগুলো আবার হাসপাতালের ঘর, বাজারের বিভিন্ন জায়গা রেখে পরিবেশটায় নষ্ট করে ফেলছে। জনগন অতিষ্ঠ। দ্রুত তাকে বদলি করা দরকার।’ চাপড়া গ্রামের মো. জিন্নাহ হোসেন বলেন,  ‘হাসপাতাল থেকে ছুটে এসে ময়লা আবর্জনা খোটে। আবার হাত না ধুঁয়ে দোড়ে গিয়ে মানুষের ওষুধ দেয়। এতে মানুষের রোগ আরও বাড়ছে। দ্রুত নাসিরকে অপসারণ করে ভালো ডাক্তার নিয়োগের দাবি তাঁর।’ ফার্মাসিষ্ট নাসির একজন মানসিক রোগী বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামীমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘অফিস আওয়ারে তো তাঁর (নাসির) বাইরে থাকার কথা না। বিষয়টি শুনেছি। ইতিমধ্যে দুজনকেই শোকজ করা হয়েছে। শোকজের লিখিত বক্তব্যটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। আর কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. কামাল হোসেন বলেন, অবশ্যই তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।