বুলবুল আহমেদ সাগর \ দৌলতপুর হোক একটি ফলের বাগান—এমনই স্বপ্ন নিয়ে একঝাঁক তরুণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডাক্তার আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসা কবিরের স্বপ্নের সবুজায়ন। ইতোমধ্যে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১২টিতে তিনি ফলজ, বনজ ও ঔষধী গাছের ১৮ হাজারের অধিক চারা রোপণ করেছেন। শুরু করে থেমে থাকেননি তিনি। নিয়মিত চারাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করে যাচ্ছেন ডাক্তার মুসা কবির। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি আল্লারদর্গায় গড়ে তুলেছেন ‘ডাক্তার মুসা কবির প্ল্যান্ট হাব’। কোথাও কোনো চারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা নতুন করে প্রয়োজন হলে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই হাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। উপজেলার জয়রামপুরে একটি সড়কের ধারে কয়েকশো আমগাছ লাগিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) সেই গাছসহ উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় লাগানো চারাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। জয়রামপুরের আমগাছ প্রসঙ্গে ডাক্তার মুসা কবির বলেন, “এখানে ১০০ এর অধিক আমগাছ লাগানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে এবার ৮০ টার মতো গাছে মুকুল এসেছে, ২-১ টা করে ফল ধরতেও শুরু করেছে। রাস্তার ধারের আমগাছ এগুলো বাচ্চারাই পেড়ে খায়”। তিনি আরও বলেন, “অনেক জায়গায় গাছ লাগাতে গিয়ে সেখানকার মাঠের কৃষকরা আপত্তি জানান। তাদের জমির ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করেন। কিন্তু এই মাঠের কৃষকরা গাছের প্রতি যত্নশীল। তারা গাছগুলো দেখে রাখে, অনেক সময় পরিচর্যাও করে”। তার এই স্বপ্নকে আরও সুসংগঠিত করতে আল্লারদর্গায় প্রতিষ্ঠিত প্ল্যান্ট হাবে বিভিন্ন প্রজাতির চারা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের হাব প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো বৃক্ষের যত্ন ও সেই চারাগুলিকে রোপণের উপযোগি করে রাখা। আমরা কোথাও গাছ লাগালে সেগুলো নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখি। পরে কোন গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই নম্বর অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত গাছের জায়গায় নতুন চারা রোপণ করি। চেষ্টা করি আমাদের লাগানো গাছের সংখ্যাটা যেনো কমে না যায়, সেটা যেনো ধরে রাখা যায়”। ডাক্তার মুসা কবির আরও বলেন, “ দৌলতপুরকে একটি ফলের বাগানে পরিণত করতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা প্রতিবছরই প্রচুর পরিমাণ ফলের গাছ লাগাবো। যাতে আজ থেকে ৫-১০ বছর পরে দৌলতপুর একটি ফলের বাগানে পরিণত হয়। সিঙ্গাপুরে আগে গার্ডেন সিটি বলা হতো। কিন্তু এখন সেই শহরকে বাগানের ভেতর একটা শহর বা ‘সিটি ইন দ্য গার্ডেন’ বলা হয়। দৌলতপুরে প্রচুর খালি জমি পড়ে আছে। আমরা সেগুলোতে ফলের গাছ লাগাতে চাই। এবং আমরা একসময় সেগুলোকে ফলের বাগানেই পরিণত করবো ইনশাআল্লাহ”। স্থানীয় বাসিন্দারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। হোগলবাড়ীয়া ইউনিয়নের আব্বাস বলেন, “আমাদের মাঠের রাস্তার ধারে মুসা কবির স্যার গাছ লাগিয়েছেন। এই গাছের ছায়ায় আমরা এসে বসবো। সেই গাছের ফলও আমরা খাবো। এটা আমাদের জন্য খুবই গৌরবের”। সেলিম রেজা বলেন, “যিনি গাছ লাগিয়েছেন, তিনি কিন্তু এই গাছের ফল পেড়ে নিয়ে যাবেন না। এই রাস্তার পথচারী ও এলাকার বাসিন্দারাই এই ফল ভোগ করবে। এই গাছের অক্সিজেন আমরা সবাই গ্রহণ করি”। শিশু শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার জানায়, “এই গাছ থেকে ফল পাওয়া যাবে, অক্সিজেন পাওয়া যাবে”। মিন্টু বলেন, “মানুষ চলাফেরা করার সময় ছায়া পাবে, ফল পাবে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ”। স্বেচ্ছাসেবী কলেজ শিক্ষক আসাদুজ্জামান শোভন বলেন, “আমরা গত ৮ বছর ধরে এখানে বৃক্ষরোপণ করে আসছি। ডাক্তার মুসা কবির স্যার আমাদের সাথে ৪ বছর। এটা স্যারের চতুর্থ সিজন। আমরা এযাবৎ ১৫ হাজারের বেশি গাছের চারা রোপণ করেছি”। নারী স্বেচ্ছাসেবী সাদিয়া শারমিন পিংকি বলেন, “গাছ লাগানোর ফলে আমরা অধিক অক্সিজেনের সরবরাহ পাচ্ছি এবং আমাদের শিশুরা ধুলাবালি থেকে রক্ষা পাচ্ছে। তারা চারপাশে গাছপালা ও প্রকৃতি পাচ্ছে। প্রকৃতির মধ্যে থাকলে বাচ্চারা এমনিতেই সুস্থ থাকে”। প্রিয়া ইসলাম বলেন, “যেসব জায়গা ফাঁকা আছে, সেসব জায়গায় যদি আমরা গাছপালা লাগাই, তাহলে আমাদের পরিবেশের অক্সিজেন ঘাটতি পূরণ হবে। পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকবে”। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ডাক্তার মুসা কবিরের এই উদ্যোগ দৌলতপুরের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, “আমি চাই, যুবসমাজের মধ্যে গাছ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হোক, তারা গাছকে ভালোবাসুক। আমার লাগানো ফলের গাছগুলো থেকে ফল আসবে, পাখিরা খাবে, পথিক ও বাচ্চারাও ফল খেতে পারবে। এবিষয়টি আমার আসলে খুব ভালো লাগে। আমরা সেটাই চাই”।
