মিজানুর রহমান নয়ন \ ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বেজে ২৭ মিনিট। তখনও দরজায় ঝুলছে তালা। উড়েনি জাতীয় পতাকা। আসেননি চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট। সুনসান নিরবতা। ফিরে যাচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গতকাল রবিবার সরেজমিন গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। আরও দেখা গেল সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে দরজার তালা খুলছেন উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (এসএসিএসও) শারমিন আক্তার। তবে তখনও আসেননি কেন্দ্রটির ফার্মাসিস্ট নাসির উদ্দিন। অথচ সকাল ৮টার মধ্যে তাঁদের কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কথা। সকাল ১০টার দিকে নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক মহিলা বলেন, বাচ্চার ঠান্ডা জ্বর কাশি। হাসপাতালে তালা লাগানো। ডাক্তার আসেনি। ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যাচ্ছি। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসকরা সকাল ১০ টা, ১১টায় আসেন। আর ১২টা বাজলেই চলে যায়। ঠিকঠাক ওষুধ দেয়না। নোংরা আবর্জনায় ভরা। কোনো সেবা নেই হাসপাতালে।

মানুষ এসে এসে ফিরে যায়। সেবা না দিয়েই মাস গেলেই বেতন তুলে নিচ্ছেন। বড় বড় কর্তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। হাসপাতালটির খোলার পর সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, বারান্দায় একটি বাঁশে বাঁধা রয়েছে জাতীয় পতাকা। পাশে ফার্মাসিস্টের কক্ষটি ময়লা, আবর্জনা ও নোংরায় ভরপুর। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে চেয়ার, টেবিল ও রোগীর জন্য রাখা একটি বেঞ্চ। এসবের উপরে থালাবাসন, প্লাস্টিকের বোতল, ছেড়া পলিথিন ও নোংরা কাগজপত্রাদি। এছাড়াও আরও দুইটি কক্ষে একভাবে ময়লার স্তুপে পরিনিত হয়ে আছে। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা মসলেম উদ্দিন বলেন, ডাক্তার ঠিকমত আসেনা। ফার্মাসিস্ট নাসির মাঝেমধ্যে এসে হাসপাতাল খুলে পথেপথে ময়লা কাগজ কুড়ো বেড়ায়। সেগুলো আবার নিয়ে হাসপাতালের কক্ষে ময়লার ভাগার বানিয়েছে। বহুবার অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। ভাড়রা গ্রামের মনোয়ার হোসেনে ছেলে সাইদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, নাসির হাসপাতালে না থেকেই বেতন তুলছেন। আর মহিলা ডাক্তার ১১টায় আসে ১২টায় যায়। এসব দেখার কেউ নাই। সরকারের কেবল লাখ লাখ টাকা অপচয় হচ্ছে। অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-সহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় আজ একটু দেরি হয়েছে। তবে ফার্মাসিস্ট নিয়ে খুব যন্ত্রণায় আছি। ঠিকঠাক আসেনা। থাকেনা। কক্ষগুলো ময়লার স্তুপে পরিনিত করে রেখেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানিয়েও কাজ হচ্ছেনা।’ তাঁর ভাষ্য, ফার্মাসিস্ট নাসির মানসিক রোগী। বিষয়টি স্যারেরা জানে। মানসিক রোগের কথা স্বীকার করে ফার্মাসিস্ট নাসির উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ‘৬০ হাজার টাকার বেশি বেতন তুলি। তিনমাস পর শনিবার বাড়ি এসেছি। শরীরডা খারাপ। সেজন্য আজ (রবিবার) যায়নি। পরিবেশ পরিস্কার রাখতে পথের ময়লা কুড়োয়।’ তাঁর ভাষ্য, ডাক্তার না থাকলে তিনি নিজেই রোগী দেখেন, ওষুধ দেন। জনবল সংকট ও ফার্মাসিস্ট অসুস্থ হওয়ায় চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির অবস্থা খুবই নাজুক। ব্যাহত হচ্ছে সেবা। এমনটা জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক শামীমা আক্তার। তিনি বলেন, বিষয়গুলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
