মাহমুদুল হাসান চন্দন \ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও এর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রগুলোর সশস্ত্র মহড়া, গোলাগুলি এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রায়ই অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় বা ড্রেজার জব্দ করলেও, প্রশাসনের গাড়ি ফিরে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় শুরু হয় বালু কাটা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বালু সিন্ডিকেটের মধ্যে এই ‘চোর-পুলিশ’ খেলায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নদী তীরবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা ও জননিরাপত্তা ফেরাতে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছাকাছি এলাকায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বসানো হয়েছে শক্তিশালী ড্রেজার। প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে, যা এই মেগা প্রজেক্টগুলোর স্থায়ী কাঠামোর জন্য বড় হুমকি। এছাড়া, বাহিরচর, বাহাদুরপুর ও রায়টা অঞ্চলের শত শত একর ফসলি জমি এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট ইতিমধ্যেই বালু টানা ড্রাম ট্রাকের ওজনে ধসে পড়েছে। বাহিরচর চরাঞ্চলের বাসিন্দা মো. আলী আকবর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিনের বেলা প্রশাসন এসে দুই-একটা জরিমানা করে চলে যায়। কিন্তু গভীর রাত হলেই নদী দখল নিয়ে শুরু হয় আধুনিক অস্ত্রের ঝনঝনানি। ২০ থেকে ২৫ রাউন্ড পর্যন্ত গোলাগুলি হয়, অফিসে আগুন দেওয়া হয়। আমরা সন্তানদের নিয়ে সারারাত আতঙ্কে জেগে থাকি। এই এলাকায় নৌপুলিশের একটি স্থায়ী শক্তিশালী ক্যাম্প ছাড়া এই বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব নয়।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “বালু ব্যবসার সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। প্রশাসনের অভিযানের খবর অপরাধীদের কাছে আগেই পৌঁছে যায়। ফলে মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গেলে মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।” স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এর আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা বা স্বল্পমেয়াদি কারাদন্ড এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে অত্যন্ত নগণ্য। সাজা খেটে বা জরিমানা দিয়ে এসে অপরাধীরা দ্বিগুণ উৎসাহে আবার নদীতে নামে। এছাড়া ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা স্পিডবোটে করে এক জেলার সীমানা থেকে অন্য জেলায় পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে নদীকেন্দ্রিক এই অপরাধের স্থায়ী পরিসমাপ্তি ঘটাতে যৌথ বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সাঁড়াশি অভিযান এবং স্থায়ী নজরদারি চৌকি স্থাপন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।