মনজুর এহসান চৌধুরী :
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহিরচর ইউনিয়নে গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের চার দশক পেরিয়ে গেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বদলেছে সরকার, বদলেছে নদীর গতিপথ, কিন্তু নদী-তীরের মানুষের জীবনে পানির অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত পুরোনো পত্রিকার কাটিং অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে ভেড়ামারার বাহিরচরে গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন সে সময়ের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার-উল-হক।
প্রথম দিকে সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হওয়া তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পটি প্রায় ১৬ কোটি টাকার ব্যয়ে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। একটি পুরোনো কাটিংয়ের শিরোনাম—“গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পটি ১৩ বছর যাবত ফাইলবন্দি”—দেখায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি কেবল কাগজে-কলমে ঘুরেছে, মাঠপর্যায়ে কাজ তেমন এগোয়নি। আরেকটি প্রতিবেদনে “গঙ্গাবাঁধ ২২ বছরেও হলো না” শিরোনামে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, ভিত্তিপ্রস্তর-পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেলেও বাঁধ নির্মাণের বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও হতাশা কতটা গভীর হয়েছে।

গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভেড়ামারা ও আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের কোটি টাকার ফসল আর হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকা। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও গঙ্গা-সংলগ্ন এই অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যায়, সেচ ব্যয় বাড়ে, অনেক ক্ষেতেই আবাদ কমে আসে। আবার বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আর আকস্মিক বন্যার ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক পরিবারকে জমি হারিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, গঙ্গা বাঁধ প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত।
এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় পর্যায়ে সাম্প্রতিক একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। সরকার বলছে, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে সেচ, কৃষি ও পানির সংকটে থাকা এলাকায় ধীরে ধীরে স্বাদু পানির জোগান নিশ্চিত করা হবে। এতে উপকৃত হতে পারে একাধিক জেলা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-নির্ভর কৃষক ও সাধারণ মানুষ।
তবে ভেড়ামারার বাহিরচরসহ গঙ্গার তীরবর্তী এলাকাগুলোর মানুষের মনে প্রশ্নও কম নয়। তাদের অভিযোগ, গঙ্গা বাঁধের মতো একটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর জাঁকজমক করে হলেও বাস্তব কাজ হয়নি, ফাইলবন্দি ইতিহাসই বেশি বড় হয়ে আছে। তাই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও তারা একদিকে যেমন আশাবাদী, অন্যদিকে একটু শঙ্কিত।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে পদ্মা ব্যারাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে ইতিহাস ফের নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে পারে। পানিবন্দি এই অঞ্চল এখন দেখছে—নতুন ব্যারাজ প্রকল্প কি সত্যিই বদলে দেবে ভেড়ামারার ভাগ্য, নাকি গঙ্গা বাঁধের মতো আবারও থেকে যাবে কেবল প্রতিশ্রুতির গল্প হয়ে।