টিআইবি রিপোর্ট থেকে সংসদীয় বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দুর্নীতির ঝড়

শনিবার, সেপ্টে ১২, ২০২৬

\ মনজুর এহসান চৌধুরী \

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের বিস্ফোরণ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। “সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫” শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছরে সরকারি ও আধা-সরকারি সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার অন্তত একবার সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। টিআইবি বলছে, দুর্নীতি এখানে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কাঠামোগত, সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক এক প্রক্রিয়া।

এই জরিপে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পাসপোর্ট অফিস, যেখানে সেবা নিতে গেলে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঘুষ দিতে হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ); ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা যানবাহন রেজিস্ট্রেশনের মতো সেবায় ঘুষকে প্রায় বাধ্যতামূলক বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিচার-সংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ভূমি অফিস ও কৃষি খাতেও উচ্চমাত্রার দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে; অনেক ক্ষেত্রে “ঘুষ ছাড়া সেবা নেই” অবস্থাকে এই জরিপ ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

টিআইবি এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা উপদেষ্টার নাম টার্গেট করেনি; বরং ঘুষগ্রহণকারীকে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও দালাল চক্র—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছে। সংস্থাটির ভাষ্যে, এই ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সেবা খাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি কমানোর ঘোষিত অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে কঠোর অবস্থান, জবাবদিহি ও প্রতীকী শাস্তির নজির গড়ে ওঠেনি—একে টিআইবি শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি হিসেবে দেখিয়েছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় জুন ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত ফলাফল তুলে ধরা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে এই রিপোর্ট সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বাস্তবতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।

এর ঠিক পরেই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিআইবির এই রিপোর্টের উল্লেখ করে বলেন, “সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে” এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকান্ড দুর্নীতি দমন কমিশন দিয়ে তদন্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে তর্ক গড়ায়—একদিকে কেউ এটিকে অন্তর্বর্তী সরকারের “দুর্নীতিবিরোধী ইমেজের ভাঙচুর” হিসেবে ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে কেউ প্রশ্ন তুলছেন, টিআইবির রিপোর্টকে কি কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি সব সরকারের আমলেই একই মানদন্ডে দায় নির্ধারণ করা হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ নাগরিকের অবস্থান আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সরকার বদলালেও সেবা পেতে ঘুষের বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকায় মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জমেছে। টিআইবির এই রিপোর্ট তাই কেবল একটি পরিসংখ্যানগত নথি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সেবা-ব্যবস্থার ওপর ভর করা এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের দলিল, যা ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারের জন্যই দায় এড়ানো কঠিন করে তুলবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট