নুরুল কাদের \ কুষ্টিয়ায় সাঁতারু তৈরির স্বপ্ন নিয়ে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সুইমিংপুল। রয়েছে প্রশস্ত পুল, দর্শক গ্যালারি ও প্রশিক্ষণের অবকাঠামো। লক্ষ্য ছিল জেলার সাঁতারকে এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ের সাঁতারু গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সুইমিংপুল আছে, পানি নেই। অবকাঠামো আছে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষক ও সাঁতারুদের উপস্থিতিও নেই। অথচ শহর থেকে অনেক দূরে মিরপুর উপজেলার আমলা গ্রামের একটি সাধারণ পুকুরকে কেন্দ্র করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাচ্ছেন কুষ্টিয়ার একাধিক সাঁতারু। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আধুনিক সুইমিংপুল নির্মাণের পরও সেটি কেন কাজে লাগছে না সমস্যা কি অবকাঠামোর, নাকি ব্যবস্থাপনার কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম সংলগ্ন সুইমিংপুলটি বাইরে থেকে দেখলে আধুনিক ক্রীড়া স্থাপনারই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বর্তমানে পুলটিতে নিয়মিত পানি নেই, নেই সাঁতারুদের আনাগোনা। দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না থাকায় স্থাপনাটি অনেকটাই নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়মিত ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রীড়া অবকাঠামো। কুষ্টিয়ার সাঁতার সংগঠক খোকন সিরাজুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘সাঁতারে দেশব্যাপী কুষ্টিয়ার পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু আজ সেই জেলা শহরের সুইমিংপুলটি অচল। অথচ আমলার পুকুরে দেশসেরা সাঁতারুরা নিয়মিত অনুশীলন করছেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচিত কমিটি থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। আশা করি কর্তৃপক্ষ শিগগিরই ভালো উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার খেলাধুলার পরিবেশকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনবে।’ কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ জানান, সুইমিংপুল পরিচালনায় জনবল সংকট রয়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চালু নেই। পুলে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়মিত নয়। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্থাপনা থাকলেও তার মূল উদ্দেশ্য সাঁতারু তৈরি ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান অবস্থার জরুরি পরিবর্তন আসা দরকার। কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া অফিসার ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মো. তানভীর হোসেন বলেন, আগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সুইমিংপুলটি ফিরিয়ে নেওয়ায় এটি চালু ছিল না। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, এটি এনএসসির লীজভুক্ত স্থাপনা। তাই লীজ দেওয়া বা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এনএসসিই নির্ধারণ করবে; জেলা ক্রীড়া সংস্থা শুধু দেখভাল করবে। তিনি বলেন, সুইমিংপুলের আয় এনএসসির হিসাবেই জমা হবে। বর্তমানে সেখানে শুধু একজন নাইট গার্ড রয়েছে। পুলের অবস্থা মোটামুটি ভালো হলেও কিছু সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। এনএসসির দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার আদনানের পুলটি মেরামত করার কথা থাকলেও তিনি আনুমানিক ২০ শতাংশ কাজ করে আর মেরামত করেননি। বারবার যোগাযোগ করেও কাজ সম্পন্ন করানো সম্ভব হয়নি। সুইমিংপুল আপাতত বন্ধ আছে। এনএসসি যখন চালু করে দেবে তখন অবশ্যই সাঁতার শুরু করা হবে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কুষ্টিয়ার ছেলেমেয়েরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাচ্ছে। নতুনকুড়ি স্পোর্টস কুষ্টিয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জনবল সংকট থাকলে তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন নিয়মিত প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না শুধু পানি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নয়, সুইমিংপুলের জায়গার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সুইমিংপুল ঘিরে জেলা ক্রীড়া সংস্থার অস্থায়ী অফিস ও গোডাউন ব্যবহারের পাশাপাশি গ্যালারি ও সিঁড়ির নিচের অংশে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা চলছে। ২৪ আগস্টের পূর্বে তৎকালীন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা নিজেরা লীজ নিয়ে এটি পরিচালনা করতো। সাম্প্রতিক সময়ে উপরের একটি রুমে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকারকে দাবা প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে ড. কাজী মোতাহার হোসেন দাবা একাডেমির কার্যক্রম চলে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৪৭টি অ্যাফিলিয়েটেড ক্লাবের খোঁজ নিতে যেখানে ব্যর্থ প্রশাসন, সেখানে সুইমিংপুলের একটি রুম ব্যবহারের অনুমতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রীড়া অফিসার নিজেই বিষয়গুলো দেখছেন এবং তিনি এ বিষয়ে সবকিছু জানেন। তবে আমার মনে হয়, এসব সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে একটি কার্যকর কমিটি না থাকা। আমি শুনেছি, সুইমিংপুলের জায়গায় ক্যান্টিন করা হয়েছে এবং সেখানে বিয়ে, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু একটি সুইমিংপুলের জায়গায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড কতটা শোভনীয়, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। কারণ, যে উদ্দেশ্যে সুইমিংপুলটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই কাম্য নয়। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, কুষ্টিয়াতে একটি সুইমিংপুল আছে, সেটি এখন সরাসরি সেন্ট্রাল থেকে দেখভাল করা হবে। তবে পাশাপাশি আমরা এখানে যারা সাঁতারে খুব ভালো তাদের নিয়ে কাজ করব। মিরপুরে অনেক সাঁতারু আছে যারা ন্যাশনাল পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা করাচ্ছি। মিরপুরে ওরা দাবি করেছে যে তাদের একটি জায়গা আছে, যেখানে সাঁতারের জন্য উপযোগী করা যায়। যা ইতিমধ্যে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

যারা সাঁতারে আগ্রহী, তারা যদি প্র্যাকটিস করতে পারে। সেখানে আপনাদের সহযোগিতা চাই এবং সকলে মিলিয়ে আমরা সুন্দর কুষ্টিয়া গড়তে চাই। সাঁতার সংগঠক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আসলে একটি অত্যাধুনিক সুইমিংপুলের অনেক দিনের দাবি ছিল। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়ায় একটি সুইমিংপুল হয়েছে। কিন্তু সেই সুইমিংপুলে আসলে কোনো পানি থাকে না। অনেক টাকা ব্যয়ে সুইমিংপুলটি নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু পুলটি সাঁতারের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, কুষ্টিয়ার যে সুইমিংপুলটি হয়েছে, সেটি আসলে সাঁতারু তৈরির ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসছে না। অথচ এটি বিশাল একটি সম্পদ। এই সম্পদটি যদি সার্বজনীনভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে শুধু কুষ্টিয়ার জন্য নয়, বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতের জন্যই এটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। সাবেক ক্রীড়াবিদ ও গণমাধ্যমকর্মী শরীফ বিশ্বাস বলেন, আমরা দেখেছি যে ৫ আগস্টের পর কুষ্টিয়ার ক্রীড়াঙ্গন দাঁড়াতেই পারেনি। কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া অফিসার ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিবের দায়িত্ব ঠিকই পেলেন কিন্তু অন্য সদস্যরা অধরা থেকে গেলেন। তার দায়িত্বহীনতা এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই ক্রীড়াঙ্গনের এই স্থবিরতা। ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার প্রতি তিনি কোনো রকমেরই আন্তরিক নন। ইচ্ছেমতো যাকে তাকে জেলা দলের হয়ে খেলোয়াড় মনোনীত এবং ইচ্ছেমতো দলের কোচ ও ম্যানেজার করেছেন। ক্রীড়া অফিসারের একক আধিপত্য ক্রীড়াঙ্গনকে বিষিয়ে তুলেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার যুবসমাজ মাঠ ছেড়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে। স্টেডিয়াম এলাকায় মাদকের আড্ডা হয় দিন ও রাতে। ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে খুব শিগগিরই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করে জেলার ক্রীড়াঙ্গনকে তাদের হাতে সোপর্দ করলে বর্তমান পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আসবে। সাঁতারে সমৃদ্ধ জেলা কুষ্টিয়ায় সুইমিংপুল থাকা সত্ত্বেও কার্যকরিতা নেই—এটা ভাবতে অবাক লাগছে। বাংলাদেশের সাঁতারকে লিড দেয় কুষ্টিয়ার সাঁতারুরা, অথচ সেই জেলার সুইমিংপুল বন্ধ রাখা হয়েছে। কুষ্টিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি আধুনিকমানের সুইমিংপুল। সরকার প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত সুইমিংপুল উপহার দিল, অথচ কয়েক বছরের মধ্যে তা বন্ধ হয়ে গেল। অথচ আমলার জরাজীর্ণ পুকুরের সাঁতার থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাঁতারুরা দাপটের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন পদকের জন্য। উল্টোদিকে কুষ্টিয়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় জিয়াউর রহমান শিশু পার্কে প্রতিদিন শতাধিক বিভিন্ন বয়সের ছেলে ও মেয়েরা সাঁতার শিখছেন। এদিকে শহরের আধুনিক সুইমিংপুল কার্যকর না থাকলেও কুষ্টিয়া পৌরসভা শহীদ জিয়া পার্কের পুকুরে শিশু-কিশোরদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে শতাধিক শিশু-কিশোর। জীবনরক্ষার পাশাপাশি তাদের সাঁতারের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কুষ্টিয়ার সাঁতারের ইতিহাস ও সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনার সংকট, জনবলের অভাব ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আমলার পুকুর ও পৌরসভার পার্কে সাঁতার চললেও কোটি টাকার পুল নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে—এ বাস্তবতাই এখন প্রশ্ন তুলছে।
