দেশে মাদকবিরোধী অভিযানে কেবল চুনোপুঁটি বা মাঠপর্যায়ের খুচরা বিক্রেতারা গ্রেফতার হলেও পর্দার আড়ালে থাকা আসল কারবারি ও গডফাদাররা অধরাই থেকে গেছেন। কিন্তু এবার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া এসব গডফাদারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ১১৬ জন গডফাদারের ১৮২ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি)। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা ৩৯টি মামলার অধীনে সংস্থাটি এই বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পর্যায়ক্রমে বাজেয়াপ্তির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-যে ক্ষেত্রই হোক না কেন, যে কোনো অপরাধ কাঠামোর প্রাণভোমরা হলো তার অর্থনীতি। ফলে দেশের শতাধিক মাদক গডফাদারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া এবং মানি লন্ডারিং আইনে মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্তটি কেবল কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের দিক থেকেও ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত। অতীতে দেখা গেছে, দেশে মাদকবিরোধী অভিযান মানেই ছিল মাঠপর্যায়ের খুচরা বাহকদের গ্রেফতার এবং কয়েকটি সাময়িক বাজেয়াপ্তির ঘটনা; কিন্তু মূল মদদদাতা বা গডফাদারদের অবৈধ সাম্রাজ্যে হাত না দেওয়ায় মাদকের নেটওয়ার্ক কখনোই ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। তাই মাদকের অবৈধ কাঠামোর বিরুদ্ধে সরকারের এই নীতি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করি আমরা। অবশ্য এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিচারিক পরিণতির ওপর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ এখনো পলাতক এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং এবং অপরাধমূলক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে জোরদার অভিযান চালানো হলেও দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল তদন্তের কারণে বহু মামলা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অর্থ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতির নানা স্তরে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হয়। যদি তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নমনীয়তা বা আইনি ফাঁকফোকরের শিকার হয়, তাহলে এই উদ্যোগ কেবল কাগুজে সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। কাজেই মাদকের মতো একটি বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে এখন আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। জামিনে থাকা এবং পলাতক গডফাদারদের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষকে আদালতে কার্যকর আইনি যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে, যাতে বিচারের মুখোমুখি করার আগেই অপরাধের লব্ধ অর্থ ও সম্পদ স্থানান্তরিত বা হস্তান্তর হতে না পারে। এছাড়া বিএফআইইউ এবং সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের মধ্যকার গোয়েন্দা সমন্বয় আরও গতিশীল করা প্রয়োজন, যাতে কেবল টেকনাফ বা ঢাকার মতো পরিচিত হটস্পটগুলোই নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনও দ্রুত নজরদারিতে আসে। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়াই হলো একটি মাদকমুক্ত ও সুশাসিত সমাজ গঠনের মূল শর্ত।
কারবারিদের অর্থনৈতিক ভিত্তি গুঁড়িয়ে দিতে হবে
রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬