৬৬ বছরের সহযোগিতা এখন নিরাপত্তা ও আস্থার পরীক্ষায়

সিন্ধু পানি চুক্তি

রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি কতদিন টিকে থাকতে পারে? দুই দেশের সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন এলে সেই চুক্তির সুবিধা কি আগের মতো বজায় রাখা সম্ভব? ভারত-পাকিস্তানের ৬৬ বছরের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে এখন এই প্রশ্নগুলোই সামনে এসেছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে এবং ঘোষণা দেয়—পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নয়াদিল্লি স্পষ্ট করেছে, নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতিকে তারা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখতে চাইছে না।

বিরোধ এবার আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তির আওতায় গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দেয়—সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা যায় না। একই সঙ্গে ভারতের রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কিছু অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাকিস্তান এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারা ওই সালিসি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও ওই ট্রাইব্যুনালের নেই।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানিতে ভারত অধিকতর অধিকার পায়। উভয় দেশকে নির্দিষ্ট শর্তে একে অপরের নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হয়। যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধ চললেও চুক্তিটি দীর্ঘ সময় কার্যকর ছিল। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটিকে দুই দেশের সফল পানি সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই। জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা বেড়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে পাহেলগাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামাসহ দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতা। ফলে পানি বা বাণিজ্যকে নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বলে মনে করে নয়াদিল্লি। ভারত চুক্তি চিরতরে বাতিল না করে স্থগিত রাখার কথা বলছে—অর্থাৎ পরিস্থিতি বদলালে ভবিষ্যতে সহযোগিতার পথ খোলা রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি হলো চুক্তি পালন করতে হবে। তবে গুরুতর চুক্তিভঙ্গ বা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রে স্থগিত বা বাতিলের আইনি ভিত্তিও রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে রাষ্ট্রগুলো পুরোনো চুক্তি থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি এবং ২০১৯ সালে আইএনএফ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। এসব সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হলেও দেখায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো প্রতিশ্রুতি নতুন করে মূল্যায়নের প্রবণতা রয়েছে।

সিন্ধু অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি, সেচ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই চুক্তি স্থগিতের ঘোষণায় পাকিস্তানের উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, চুক্তির সুবিধা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আর আলাদা করে দেখার মতো অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক নেই।

দ্য হেগের রায় আইনি বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু এটি দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাস দূর করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। সম্পর্কের সংকট শুধু চুক্তির ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাশ্মীর এবং পারস্পরিক আস্থার গভীর সংকট। ভারতের অবস্থান—পানি সহযোগিতা স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন। পাকিস্তানের জন্য চুক্তির ধারাবাহিকতা পানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা সম্পর্কের উন্নতি হলে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি বদলানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। ৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা এই চুক্তি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। একসময় যুদ্ধ ও বৈরিতার মধ্যেও এটি দুই দেশকে পানি সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

পানি বণ্টনের নিয়ম চুক্তিতে নির্ধারিত। কিন্তু সেই চুক্তি কার্যকর রাখার জন্য যে রাজনৈতিক আস্থা প্রয়োজন, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ। সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ তাই শুধু পানির প্রশ্ন নয়—এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা নীতি এবং পারস্পরিক আস্থারও একটি পরীক্ষা।