এবার বাংলাদেশের পালা: সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার

বুধবার, অক্টো ২৮, ২০২৬

নিজ সংবাদ:

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর কূটনৈতিক সম্পাদক শুভজিৎ রায়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বিষয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশকে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে উল্লেখ করে পিনাক রঞ্জন বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশটির সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। তার মতে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কে তিনি ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, ওই সময়ে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে পিনাক রঞ্জন বলেন, এ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র আলোচনা রয়েছে। তবে তার মতে, দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ চাইলেই ভারতকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। চিকিৎসা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও মানুষে-মানুষে সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন তৈরি করেছে।

ভারতের নীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ভারতের লক্ষ্য তাদের সঙ্গে কাজ করা। সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নির্বাচিত সরকার—সব ধরনের সরকারের সঙ্গেই ভারত অতীতে কাজ করেছে। তাই মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক বন্ধ করার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জন বলেন, তার সরকারের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের কোনো কারণ ছিল না। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ জানালেও বিষয়টি একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, তা অবশ্যই সম্ভব। তবে দুই দেশেরই সদিচ্ছা প্রয়োজন। তার ভাষায়, ভারত যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখিয়েছে, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ঢাকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভারত সাধ্যমতো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জন বলেন, ইসলামপন্থি ও সন্ত্রাসীদের পুনর্গঠনের বিষয়টি ভারতের জন্য উদ্বেগের। বাংলাদেশে উগ্রবাদ পুনরুত্থান করলে তার প্রভাব ভারতের ওপরও পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

পানি বণ্টন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কথা বলেন তিনি। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে বর্তমানে গঙ্গা পানি চুক্তিই প্রধান কার্যকর চুক্তি হিসেবে রয়েছে। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে দরকষাকষি কঠিন হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে পিনাক রঞ্জন বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ চীন থেকে আসে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানেরও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। তবে তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এসব ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।