দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে ২০ লাখ সবুজ স্বপ্নের অভিযাত্রী প্রকৌশলী টুটুল

কুষ্টিয়ার একজন বৃক্ষপ্রেমি মানুষের গল্প

রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬

 

 

নিজ সংবাদ \ পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্ম নেন নিজের জন্য। আবার কিছু মানুষ জন্ম নেন পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে রেখে যাওয়ার জন্য। প্রকৌশলী টুটুল সেই মানুষদের মধ্যে একজন। তিনি পেশায় একজন খ্যাতিনামা প্রকৌশলী হলেও তাঁর  জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন বৃক্ষপ্রেমি (গাছপাগল মানুষ)। একজন সবুজ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়, প্রায় ৩২ বছর আগে যখন পরিবেশ রক্ষা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমাজে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না, এমনকি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বর্তমান সময়ের মতো জনপ্রিয় ছিল না, ঠিক তেমনি একটি সময় তরুণ প্রকৌশলী টুটুল নিজের হৃদয়ে লালন করেছিলেন এক অসাধারণ স্বপ্ন—তিনি গাছ লাগাবেন, মানুষকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করবেন, আর সবুজে ভরে তুলবেন এই দেশ। প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুল তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৯৫ সালে। তিনি চাকুরীর শুরুতে ঝিনাইদহ পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে ১৯৯৮-২০০০ সাল পর্যন্ত পাবনা পৌরসভায়, ২০০০ সালে কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) এবং পরবর্তীতে মেহেরপুর পৌরসভায় নির্বাহী প্রকৌলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১৭-২০২০ সাল পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে স্বেচ্ছায় প্রধান প্রকৌশলীর পদ ছেড়ে দিয়ে তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চাকুরীরত অবস্থায় যেখানেই অবস্থান করেছেন সেখানেই বৃক্ষরোপন ও বিতরণ কর্মসূচি চালিয়ে গেছেন।

প্রকৌশলী টুটুল চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি তাঁর নিজের বেতনের কিছু টাকা বাঁচিয়ে কিনতেন বিভিন্ন জাতের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। তারপর ছুটে যেতেন গ্রামের স্কুলে, শহরের বিদ্যালয়ে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতেন একটি করে সবুজ স্বপ্ন। তিনি শুধু চারা দিতেন না; তিনি দিতেন ভবিষ্যতের আশা। তিনি শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন—

“গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়। গাছ বৃষ্টি আনে। গাছ না থাকলে নদী শুকিয়ে যাবে, ফসল হবে না, পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হবে। গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয়। জীবনের কঠিন সময়ে একটি বড় গাছও হতে পারে পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই আজ একটি গাছ লাগাও, আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও। প্রকৌশলী টুটুলের সেই কথাগুলো শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। তারপর আনন্দভরে চারাগুলো নিয়ে বাড়িতে ফিরত। যত্ন করে রোপণ করত নিজেদের আঙিনায়। অনেক বছর পর সেই শিশুরাই বড় হয়ে ফল হাতে নিয়ে আবার ফিরে আসত টুটুলের কাছে। বলত—স্যার, এটা আপনার দেওয়া গাছের প্রথম ফল। এই একটি মুহুর্তই যেন তাঁর সমস্ত ক্লান্তির পুরস্কার হয়ে উঠত।

কিন্তু প্রকৌশলী টুটুলের জন্য এই পথটি মোটেও সহজ ছিল না। তিনি দিনভর অফিসের দায়িত্ব পালন করার পর, যখন সবাই বিশ্রাম নিত, তখন শুরু হতো তাঁর  জীবনের আরেকটি যুদ্ধ। তিনি রাতভর জেগে বেসরকারি বাড়ির নকশা ও ডিজাইনের কাজ করতেন। সেই কাজ থেকে যা উপার্জন হতো, তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় করতেন গাছের চারা কেনার পেছনে। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে তাঁর সংসারের বাজার করার টাকাও খরচ হয়ে যেত চারাগাছ কেনার পিছনে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার আগে তিনি ভেবেছেন—এই টাকায় আরও কতগুলো গাছ কেনা যায়” বিলাসিতা কখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ তাঁর নেশা ছিল একটাই—গাছ বিতরণ এবং গাছ লাগানো।

প্রকৌশলী টুটুলের সাথে আলাপকালে জানাযায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সময় থেকেই তিনি পরিবেশ বিষয়ক লেখা পড়তেন। সেখান থেকে তিনি  জানতে পেরেছিলেন পৃথিবীর বন ধ্বংস হচ্ছে দ্রুত। মানুষের লোভে কাটা পড়ছে লাখ লাখ গাছ। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। এমনকি পৃথিবীর “ফুসফুস” নামে পরিচিত আমাজন বনও রক্ষা পাচ্ছে না। সেদিনই তিনি নিজের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—সবাই যদি গাছ কাটে, আমি অন্তত গাছ লাগাবো। সবাই যদি নীরব থাকে, আমি অন্তত মানুষকে সচেতন করব। সেই প্রতিজ্ঞাই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। গত ৩২ বছরে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন। লাখো শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়েছেন সবুজের উপহার। নিজের হাতে রোপণ ও বিতরণ করেছেন প্রায় ১১ থেকে ১২ লক্ষ গাছের চারা। তাঁর স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। তিনি ঘোষণা করেছেন ২০ লক্ষ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করবেন। আজ তাঁর বয়স বেড়েছে, কিন্তু স্বপ্ন দেখায় এখনও সে তরুণ। আজ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁর সন্তান তোফায়েল আহমেদ সাকিব। বাবা-ছেলে যখন বাড়ির নকশার কাজে দেশের বিভিন্ন জেলায় যান, তখন শুধু নকশা নিয়েই ফেরেন না। সঙ্গে থাকে কিছু চারাগাছ। কাছাকাছি কোনো স্কুল খুঁজে বের করেন। তারপর শিশুদের হাতে তুলে দেন ভবিষ্যতের সবুজ পৃথিবীর বীজ। তাঁদের কাছে প্রতিটি চারা শুধু একটি গাছ নয়; একটি স্বপ্ন, একটি দায়িত্ব, একটি আমানত।

প্রকৌশলী টুটুল বলেন, আজ দেশে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন সকলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে। এই দৃশ্য দেখে আনন্দে আমার চোখে জল চলে আসে। ৩২ বছর আগে এ কাজ আমি একাই শুরু করেছিলাম। আজ হাজার হাজার মানুষ এ পথে হাঁটছে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। টুটুল বলেন, আমি কখনো কোনো পুরস্কারের জন্য কাজ করেননি। কখনো সম্মাননা বা প্রচারের আশায় গাছ লাগাইনি। শুধু বিশ্বাস করেছি-মানুষ একদিন চলে যাবে, কিন্তু একটি গাছ শত বছর বেঁচে থেকে মানুষের উপকার করবে। তাই পৃথিবীর জন্য রেখে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপহার হচ্ছে গাছ। প্রকৌশলী টুটুল আজও স্বপ্ন দেখেন—একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে। প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে। সেই দিন এই দেশ আরও সবুজ হবে, আরও সুন্দর হবে। তিনি সকলের কাছে শুধু একটি দোয়াই চান-মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ কাজ করে যাওয়ার তাওফিক দেন। কারণ একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন করা। তিনি মনে করেন-হয়তো একদিন মানুষ তাঁর নাম ভুলে যাবে। কিন্তু তিনি যে লাখো গাছ পৃথিবীর বুকে রেখে যাচ্ছেন, সেগুলো বাতাসে দুলে দুলে আগামী প্রজন্মকে বলে যাবে—একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের সুখের চেয়ে পৃথিবীর সবুজকে বেশি ভালোবেসেছিলেন।

উল্লেখ্য প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুল শিক্ষার মান উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করায় ২০০৮ সালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবক নির্বাচিত হন এবং দেশ সেরা সমাজ সেবক হিসেবে মনোনয়ন পান।