কুমারখালীর কয়ায় নাসির উদ্দিনের সবুজ স্বপ্ন

বিলুপ্তপ্রায় গাছের নীরব সংরক্ষক

রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬

 

 

মিজানুর রহমান নয়ন \  কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামে এক অসাধারণ উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাসির উদ্দিন। প্রায় ৬৫ বছর ধরে তিনি নিজ উদ্যোগে দেশি-বিদেশি বিলুপ্তপ্রায় গাছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে চলেছেন। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে এখনও অব্যাহত রেখেছেন তাঁর এই বৃক্ষপ্রেম। নাসির উদ্দিনের বাগানে বর্তমানে কালমেঘ, নিশিন্দা, দুধরাজ, লজ্জাবতী, তুলসী, পাথরকুচি, নিমসহ অন্তত ২০০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় গাছ রয়েছে। ওষুধি, ফলজ, বনজ ও শোভাবর্ধনকারী গাছের এই সম্ভার শুধু সংরক্ষণই নয়, তিনি তা বিনামূল্যে বিতরণও করে থাকেন। গাছ ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন, “গাছ মানুষকে অক্সিজেন দেয়, মানুষ গাছকে কার্বন ডাই-অক্সাইড দেয়। এই বাঁচা-মরার সম্পর্কই আমার গাছপ্রেমের মূল উৎস।” ১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া নাসির উদ্দিন ১৯৬৯ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পরও তাঁর কর্মকান্ড থেমে থাকেনি। প্রায় ৩৩ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন এক সবুজ বাগানবাড়ি। এখানে শুধু গাছই নয়, রয়েছে একটি ছোট জাদুঘর, পাঠাগার, সংবাদ সংগ্রহশালা এবং শহীদ মিনার। এটি এখন শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও বিনোদনের অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন তাঁর বাগানে। কেউ ওষুধি গাছ নিতে, কেউ ফল খেতে, আবার কেউ শুধু প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে। নাসির উদ্দিনের মেয়ে ইমরাত জানান, “ফল পাকলে আব্বা স্কুল থেকে বাচ্চাদের ডেকে এনে তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ঔষধি গাছ নিতে আসেন।” স্থানীয় বাসিন্দা মোহনা বলেন, “স্যারের মতো ভালো মনের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। যার যা দরকার, বিনামূল্যে নিয়ে যায়।” শিশু আহাদের ভাষায়, “এখানে খেলি, বই পড়ি, ফল খাই—সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগে।” স্থানীয় প্রশাসনও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, “এরকম সাদা মনের মানুষ আমাদের দেশে খুব প্রয়োজন। আমরা তাঁকে সাধ্যমতো সহায়তা করব।” নাসির উদ্দিনের বক্তব্য, “এমন প্রতিষ্ঠান যদি না থাকে, তাহলে মানুষ গড়ে উঠবে না।” আত্মকেন্দ্রিক সমাজে তাঁর নিঃস্বার্থ এই প্রচেষ্টা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্থানীয়দের দাবি—এই অনন্য উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সহায়তা দিয়ে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হোক। নাসির উদ্দিনের সবুজ স্বপ্ন শুধু গাছ বাঁচাচ্ছে না, নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা শেখাচ্ছে।